টায়ার পাংচারে মিশন ‘তিস্তা জাবি?’

মাইদুল ইসলাম

বাইকের পেছনের টায়ারটা পাংচার হয়ে গেল। রাত সাড়ে নয়টায় করোনা লকডাউনের এই সময়ে মোটর মেকানিক খুঁজে পাওয়া যাবে কিনা তা নিয়ে চিন্তার চেয়ে বেশি চিন্তা হলো মাঝরাস্তায় আমরা এখন করবোটা কি?

আমরা বলতে আমি, তানভীর তুষার ভাই আর হাসান তৌফিক ভাই। শুক্রবার সারাদিনের ঘোরাঘুরর লম্বা প্ল্যানের অংশ হিসেবে সকাল সাড়ে ছয়টায় ফোন দিয়ে ঘুম ভাঙানোর চেষ্টা করেছেন তৌফিক ভাই। কিন্তু ঘুম ভাঙেনি। পরে সকাল ৬ টা ৫৮ মিনিটে প্রিয় মানুষের ফোনে ঘুম ভেঙে যায়। উঠে রেডি হয়ে যখন হাতিবান্ধায় পৌঁছলাম ততক্ষণে ৮ টা পেরিয়েছে। তুষার ভাইকে নিয়ে এবার বটতলায়। সেখানে তৌফিক ভাইয়ের আসতে দেরী দেখে সকালের নদী দেখার সুযোগ হাতছাড়া করিনি আমরা। এরপর মিশন শুরু। মিশন ‘তিস্তা জাবি?’

সকাল সাড়ে আটটায় বৈশাখীতে সকালের নাস্তা সেরে যখন ফজলে রাব্বী ভাইয়ের দরজায় নক করলাম, তখনো ঘুম ভাঙেনি ওনার। সবকিছু গুছিয়ে যখন বের হয়েছি, প্রথমবারের মতো বাইকের চাকা পাংচার হলো। সেটা ঠিকঠাক করে ১১ টা নাগাদ আমরা রওয়ানা দিলাম।

টি বাঁধে দল বেঁধে নদীর জলে পা ভেজানোর উদ্দেশ্যে যাত্রা।

‘বয়সটা বেড়েছে রে, কিন্তু বুড়ো এখনো হইনি’- তিস্তা ব্যারেজ পেরিয়ে টং দোকানে যখন চা খাচ্ছিলাম তাহিজার শান্তি ভাই কথার মাঝখানে বলে উঠলেন এই কথা। সরকারি কলেজের বাংলার এই শিক্ষক এককালে জাহাঙ্গীরনগরের বাংলার ছাত্র ছিলেন। চায়ের কাপের এই আড্ডায় ওনার মুখ থেকে সংস্কৃতি চর্চার নানা হিতোপদেশ শুনতে শুনতেই যোগ দিলেন মেহেদী সুমন ও এমদাদুল ইমু ভাই। আরেকদফা চা-টা শেষ করার উপক্রম যখন, এমন সময় আমাদের হোস্ট রাফি আল আমিন ভাই উপস্থিত।

এবারের গন্তব্য তিস্তা ব্যারেজের পাশের টি বাঁধ। আকাশে মেঘ জমেই আছে। মাঝে মাঝে গুঁড়িগুড়ি বৃষ্টি ছিটিয়ে জানান দিচ্ছে, এটা বর্ষাকাল। কিন্তু সেদিকে কারও ভ্রুক্ষেপ নেই। ৯০ দিনের বেশি সময় ধরে গৃহবন্দি থাকতে থাকতে একেকজনের অবস্থা কাহিল। এই লম্বা সময়ের বন্দিত্বের দুঃখ ভুলতেই এই মিশনের আয়োজন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ছাত্রদের একধরনের পুনর্মিলনী বলা যায়। তাই ঝড়-বৃষ্টি সব উপেক্ষা করেই চলতে থাকলো আড্ডা।

টি বাধে সবাই

ঘন্টাখানেক পর তিস্তা ব্যারেজের পাশ ধরে আমরা যখন জেলেদের বৈরালি মাছ ধরা দেখছিলাম, তখন বদরুল আলম রাসেল ভাই সস্ত্রীক যুক্ত হলেন। এর কিছুক্ষণ পর সৈকত ভাই। ফজলে রাব্বী ভাই যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। বেচারা এতক্ষণ না পারছিলেন একূল ধরতে, না ওকূল। এবার দুইকূল রক্ষার ব্যবস্থা হয়েছে তাঁর।

টি বাঁধে মাছ ধরছেন জেলে

একজন রাফি ভাই
তিস্তা ব্যারেজের এই ঘোরাঘুরি শেষ করে আমরা গেলাম রাফি ভাইয়ের বাসায়। নীলফামারী জেলার শুটিবাড়িতে। বাসায় পা দিয়ে বোঝা গেল, এটা শুধু একটা বাসা নয়, পুরো ‘সার্ভিস সেন্টার’। পড়াশোনার পাট চুকিয়ে চাকরির জন্য অপেক্ষা না করে নিজেই সম্পদ কাজে লাগিয়ে নিজের বাড়িকেই সার্ভিস সেন্টার বানিয়ে নিয়েছেন তিনি।

আড্ডা চলছেই

ড্রয়িংরুমে বসে যখন আড্ডা দিচ্ছিলাম, একটু পর পরই সুস্বাদু খাবারের ঘ্রাণ নাকে আসছিলো। সেই ঘ্রাণ নাকে রেখেই আমরা দেখতে গেলাম রাফি ভাইয়ের ‘হাঁস ও মাছ’ চাষের প্রজেক্ট দেখতে। বাড়ির পাশেই লাগোয়া পুকুরে তার এই প্রজেক্ট। পুকুরে পর্যাপ্ত মাছ ছেড়েছেন। আর পুকুরের ওপরে রেখেছেন চারশো হাঁস রাখার ব্যবস্থা। শুধু হাঁসের খাবার দিলেই চলে, মাছের খাবার লাগে না। এই প্রজেক্ট সফল হতে বড় লাভের আশা দেখছেন তিনি। পুকুরের চার ধারে নানান গাছের পাশাপাশি নতুন করে সজনে ডাটার গাছ লাগিয়েছেন রাফি ভাইয়ের বাবা। এই উদ্যোগ একদিন তাঁকে সফল কৃষি উদ্যোক্তার খেতাব দেবে, সেকথা কেউ কি ভাবলো তখন?

রাফি ভাইয়ের ‘হাঁস-মাছ প্রজেক্টের’ খাবার দেখছেন সবাই

কৃষির প্রতি তাঁদের এই মায়া দেখতে দেখতে বিকেল গড়ালো। আর আমরা গিয়ে বসলাম রাফি ভাইয়ের অফিসে। ঠিক অফিস না, সেবা কেন্দ্র। করোনার এই দুঃসময়ে তিনি এলাকাবাসীর জন্য ফ্রি হ্যান্ড স্যানিটাইজার বিলি করার ব্যবস্থা করেছেন। করোনার শুরু থেকেই এলাকাবাসীকে এই সেবা দিয়ে আসছেন তিনি।

সারাদেশে যখন কেএন-৯৫ মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, সার্জিক্যাল মাস্ক, পিপিইসহ অন্যান্য সামগ্রীর বেজায় অভাব ও চড়া দাম। সেই সময়ে সবার স্বাস্থ্যসুরক্ষার কথা ভেবে এসব পণ্য সরবরবাহ করে চলেছেন তিনি। না, একেবারে ফ্রিতে নয়, এসব পণ্য দিচ্ছেন ন্যায্যমূল্যে। বললেন, যাই হোক না কেন, নিজের ভালোলাগার এই কাজটা তিনি করে যাবেন।

গল্প ফুরোয় না
এদিকে গল্প ফুরোয় না। দীর্ঘদিন পর এতগুলা সিনিয়র-জুনিয়র একসাথে হয়েছে, এ যেন এই দুঃসময়ে স্বপ্নের মতো। তাই স্বপ্নের মতোই আড্ড চলতে থাকলো। সাবেক ভাইয়েরা ক্যাম্পাসের সুখ-দুঃখের গল্পে এমন মজে গেলেন যে, বিকেল চারটা পেরোলেও কারও কোন খবর নেই। ততক্ষণে খাবারের ডাক পরে গেছে। সবাই মিলে দুপুরের খাবার খেতে গিয়ে অবাক, এই অল্প সময়ে ভাবী খিঁচুড়ি, গরু, মুরগী, মাছ, পটল ভাজি, বেগুন ভাজি এনে হাজির করেছেন টেবিলে। রাফি ভাই বললেন, খুবই হালকা খাবার, চটপট খেয়ে নেন। আসলেই খুবই হালকা খাবার ছিল!

ফেরার অপেক্ষায়…

এবার ফেরার পালা। না এত তাড়াতাড়িও কেউ ফিরছে না। আবার সেই টি বাঁধে। নদীর ধারে বসে সূর্যাস্ত না দেখে কেউ ফিরবে না। তাঁর আগে নৌকাযোগে নদীর বুকেও একবার ভেসে আসা চাই। একজন মাঝিকে পাওয়া গেল। সন্ধ্যার আগে আগে নৌকা ভ্রমণের শখও মিটলো। এরপর সূর্যাস্ত। কিন্তু আড্ডা শেষ হয়। তিস্তা ব্যারেজের ওপর গিয়ে আরেকদফা আড্ডা।

সময় গড়িয়েছে দেখে আমি, তুষার ভাই আর তৌফিক ভাই রওয়ানা দিলাম আড্ডা ছেড়ে। পারুলিয়া পেরিয়ে হলো বাইকের চাকা পাংচার। বাইকটা যখন ভ্যানে ওঠানোর আগে তৌফিক ভাইকে পাঠিয়ে দিয়েছি বাসায়। কিন্তু ২০ মিনিটে তিনি ৮ বারের বেশি ফোন দিয়ে ফেলেছেন। অবশেষে মেকানিক পাওয়া গেল, তিনি জানালেন টিউব ছিড়ে গেছে, নতুন একটা লাগাতে হবে। এবার আরেক যন্ত্রণা, হাতিবান্ধা গিয়ে একটা দোকান খোলা পাওয়া গেলো, টিউব পরিবর্তন করে একা বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম আমি… ফাঁকা ঢাকা-বুড়িমারির মহাসড়কে বাইকের সর্বোচ্চ গতির সঙ্গে আমার সঙ্গী তখন সারাদিনের মধুর জাহাঙ্গীরনগর।

মাইদুল ইসলাম, ভ্রমণপিপাপু সাংবাদিক