নিজের কর্মে আলোচিত যাঁরা

যদি প্রশ্ন করা হয় পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষ কে? পৃথিবীর শুরু থেকে জন্ম নেয়া লক্ষ কোটি মানুষের মধ্যে কে শ্রেষ্ঠতম? এক্ষেত্রে উত্তর করতে প্রায় আমাদের সবাইকেই নাকানিচুবানি খেতে হবে তাইনা? তো আজকে আমরা আমাদের পৃথিবীর ইতিহাস এবং মানুষের জীবনে যাদের প্রভাব সবচেয়ে বেশি ছিল সেরকম পাঁচজনের গল্প বলবো। প্রভাব বলতে কিন্তু শুধু সুপ্রভাবের কথাই বলা হয়নি বরঞ্চ কুপ্রভাবের ক্ষেত্রকেও টেনে আনাটা জরুরি।

পাবলো পিকাসো
২৫শে অক্টোবর ১৮৮১ স্পেনের ভূমধ্যসাগরীয় দক্ষিণ উপকূলে কাতালান প্রদেশের মালাগা শহরে পিকাসোর জন্ম। বাবা ডন জোস রুইজ ব্লাসকো ছিলেন আর্ট স্কুলের শিক্ষক এবং শহরের একটি মিউজিয়ামের কিউরেটর। ডন জোস ছেলের নাম রাখলেন ‘পাবলো নেপোমুসেনো ক্রিসপিনয়ানো দ্য লা সান্তিমাসসিমা ত্রিনিদাদ রুইজ পিকাসো’। এই বিশাল নাম ধরে ডাকা কারোর পক্ষেই সম্ভব ছিল না। তাই ছোট্ট করে পাবলো রুইজ ডাকা হতো। রুইজ ছিল তার পিতার পদবি, পিকাসো মাতৃকুলের পদবি।

বড় হয়ে পিতৃকুলের পদবি বর্জন করে শিল্পী নিজের নাম রাখলেন পাবলো পিকাসো। এই নামেই আজ তিনি জগৎবিখ্যাত এবং আলোচিত। ছবি আঁকার হাতেখড়ি তার বাবার কাছে। শিশু বেলা থেকেই পিকাসোর মধ্যে ছিল ছবির প্রতি গভীর অনুরাগ। শোনা যায় যখন তিনি তিন বছরের শিশু, একটা পেনসিল কিম্বা কাঠকয়লা পেলে কাগজ কিংবা মেঝের উপরেই ছবি আঁকতে আরম্ভ করে দিতেন। সেরা ছবি অঙ্কন করে শিল্পের ইতিহাসে পিকাসো যে পরিমাণ অর্থ পেয়েছেন তার এক শতাংশও কেউ পায়নি। তার ছবির জন্য লক্ষ মুদ্রা ব্যয় করতে সামান্যতম দ্বিধা করে না।

অর্থ, খ্যাতি, সম্মান, নারীসঙ্গ পিকাসোর জীবনে অপরিমেয়ভাবে এলেও তা কখন তার শিল্পসৃষ্টিকে ব্যাঘাত করেনি। শুধু শিল্পী নয়, পিকাসো ছিলেন কবি। তার কবিতা সে যুগে যথেষ্ট সমাদর পেয়েছিল। ১৯৭৩ সালের ৮ই এপ্রিল ফ্রান্সের মুগা শহরে পিকাসোর শিল্পজীবনের চির সমাপ্তি ঘটল। প্রকৃত পক্ষে পিকাসোর জীবনটাই ছিল এক বিরাট শিল্প। মৃত্যুতেও যে শিল্পের লয় হয় না।

উইলিয়ম শেকস্পিয়র
বিশ্বে ইতিহাসে উইলিয়ম শেকস্পিয়র এক বিস্ময়। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ নাট্যকার- যাঁর সৃষ্টি সম্বন্ধে এত বেশি আলোচনা হয়েছে, তার অর্ধেকও অন্যদের নিয়ে হয়েছে কিনা সন্দেহ। অথচ তাঁর জীবনকাহিনী সম্বন্ধে প্রায় কিছুই জানা যায় না বললেই চলে। ইংল্যান্ডের ইয়র্কশায়ারের অন্তর্গত এভন নদীর তীরে স্ট্রাটফোর্ড শহরে এক দরিদ্র পরিবারে শেকস্পিয়র জন্মগ্রহণ করেন। নাট্যজগতের সাথে তার পরিচয় অন্তরের সুপ্ত প্রতিভার বীজকে ধীরে ধীরে অঙ্কুরিত করে তোলে।

নাট্য সম্পাদনা কাজ করতে করতেই তিনি অনুভব করলেন দর্শকের মনোরঞ্জনের উপযোগী ভালো নাট্যকের একান্তই অভাব। মঞ্চের প্রয়োজনেই তাঁর নাটক লেখার সূত্রপাত। তিনি তাঁর নাটকের প্রায় প্রতিটি কাহিনী ধার করেছেন বিভিন্ন সাহিত্যিকদের রচনা থেকে। তার কৃতিত্ব তিনি সাধারণ কাহিনীকে উত্তরণ ঘটিয়েছেন এক অসাধারণ কাহিনীতে। ক্ষুদ্র দিঘির মধ্যে এনেছেন সমুদ্রের বিশালতা। শুধু নাট্যকার নয়, কবি হিসেবেও তিনি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কবিদের অন্যতম। তাঁর প্রতিটি কবিতাই এক অপূর্ব কাব্যদ্যুতিতে উজ্জ্বল।

দু’টি কাব্য এবং ১৫৪ টি সনেট তিনি রচনা করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য কমেডি হল লাভস লেবার লস্ট, দি ট্য জেন্টলম্যান অফ ভেরোনা, দি টেমিং অফ দি শ্রু, কমেডি অফ এররস, এ মিড সামার নাইটস ড্রিম, মার্চেন্ট অফ ভেনিস, ম্যাচ এ্যাডো এ্যাবাউট নাথিং, টুয়েলফথ নাইট, এ্যাজ ইউ লাইক ইট। তাঁর প্রতিভার পূর্ণ বিকাশ ঘটেছে হ্যামলেট নাটকে। এই চরিত্রটি মানুষের চির রহস্যের, কখনো তার উন্মাদের ভাব, কখনো উচ্ছ্বাস, কখনো আবেগ, এরই সাথে ঘৃণা, বিদ্বেষ, ক্রোধ, প্রতিহিংসা। শেকস্পিয়রের শেষ পর্যায়ের লেখাগুলি ট্রাজেডি বা কমেডি থেকে ভিন্নধর্মী। ১৬১৬ সালের ২৩শে এপ্রিল তিনি নিহত হন।

রাণী এলিজাবেথ
ইংল্যান্ডের রানী প্রথম এলিজাবেথ তাঁর প্রথম আইন সভার অধিবেশনে যে স্মরণীয়া উক্তিটি করেছিলেন, সম্ভবত সেটাই ছিল তাঁর জীবনের আন্তরিকতার ছোঁয়ায় রাঙানো প্রথম ও শেষ বক্তব্য। তিনি বলেছিলেন, ‘আমার প্রজাদের শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা ভিন্ন আমার কাছে পৃথিবীর কোনো কিছুই মূল্যবান নয়’।

যদিও টিউডরদের হাতে প্রাণ দিতে হয়েছিল অসংখ্য মানুষকে, আর সেই রক্তস্নাত পিচ্ছিল পথ ধরেই তিনি আরোহণ করেছেন সিংহাসনে, তবুও কিন্তু তিনি তাদের ভালোবাসা অর্জনে সমর্থ হয়েছিলেন। শুধু অর্জন নয়। সে ভালোবাসা তিনি রক্ষাও করেছিলেন; হ্যাঁ, তাঁর রাজত্বের শেষ দিকের দুঃখময়, বিবর্ণ দিনগুলিতেও যখন তাঁকে চিত্রিত করা হয়েছে শয়তানিতে ভরা ঝগড়াটে এক রক্তবর্ণা স্ত্রীলোক হিসেবে- তিনি লালায়িত ছিলেন যুব-সম্প্রদায়ের ভালোবাসার জন্য; যদিও অবশ্য এর জন্য উচ্চ- পদস্থ বা সাধারণ, কোনো ব্যক্তিকেই বঞ্চিত করতে বা বিপদে ফেলতে তাঁর হাত এতটুকি কাঁপেনি।

পৃথিবীর সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত মহিলা এই এলিজাবেথ প্রেমাসক্তিতে ছিলেন উদ্দাম, বল্গাহারা, নির্মম। একটুকরো নিখাদ ভালোবাসার জন্য তিনি পারতেন না এমন কাজই পৃথিবীতে ছিল না। সিংহাসনে যখন তিনি বসেন তখন তাঁর বয়স মাত্র পঁচিশ- অসম্ভব সুন্দরী, প্রচন্ড বুদ্ধিমতী এবং ভাবপ্রকাশহীন চতুর ও কুটিল এক মহিলা। তাঁর জন্মের বৈধতা নিয়ে হাজারটা প্রশ্ন উঠতে পারে, যে কাগজে অ্যারাগণের ক্যাথারিনের বিবাহকে অস্বীকার করে অ্যান বোলিনকে রাণী করার কথা বলা হয়েছিল সেই কাগজের বক্তব্যের সত্যাসত্যকে ঘিরে অনেক শ্লেষোক্তি থাকতে পারে কিন্তু কেউ কখনোই এটা অস্বীকার করতে পারবেনা যে এলিজাবেথ ছিলেন রাজা অষ্টম হেনরীর কন্যা।

তাই তাঁর কেশদামে লালচে-সোনালীর স্পর্শ, চোখের মণিতে নীলিমার আভা এবং গোলাপী ত্বকে সজীবতা ও মসৃণতার ছোঁয়া লাগা ছারাও জন্মসূত্রে তিনি তাঁর বাবার কাছ থেকে লাভ করেছিলেন তীক্ষ্ণ উপস্থিত বুদ্ধি, কূটনৈতিক দক্ষতা, প্রচন্ড ঔদ্ধত্য, সৌজন্যহীন অহংভাব, চূড়ান্ত বিবেকহীনতা এবং শিক্ষানুরাগ। আর, অ্যানবোলিনের মেয়ে হিসেবে এইসব বৈশিষ্ট্য এবং গুণের সঙ্গে তিনি যোগ করেছিলেন নারীসুলভ সমস্ত রকমের চাতুর্য ও কৌশল। তিনি ১৫৩৩ খ্রিস্টাব্দে জন্ম নেন এবং ১৬০৩ খ্রিস্টাব্দে পৃথিবী থেকে চির বিদায় নেন।

অ্যাডলফ হিটলার
হিটলারের জন্ম ১৮৮৯ সালের ২০ এপ্রিল অস্ট্রিয়া ব্যাভেরিয়ার মাঝামাঝি ব্রনাউ নামে এক আধা গ্রাম আধা শহরে। তিনি ছিলেন এক বিকৃত মানসিকতার শিকার। তিনি স্বপ্ন দেখতেন সমস্ত পৃথিবী হবে তার ন্যাৎসী বাহিনীর পদানত। নিজের স্বপ্নকে পূর্ণ করবার জন্য তিনি জার্মান বাহিনীকে গড়ে তুলেছিলেন। নিজে অল্প শিক্ষিত হয়েও অনুভব করেছিলেন যুদ্ধে বিজ্ঞানের উপযোগিতা। তাই শুধু সুদক্ষ সৈন্যবাহিনী গড়ে তোলেননি। তার অহমিকা, রক্তপিপাসু দানবের মতো মানবজাতিকে ধ্বংস করবার ইচ্ছা।

কোনো সমস্যায় আটকে আছো? প্রশ্ন করার মত কাউকে খুঁজে পাচ্ছ না? যেকোনো প্রশ্নের উত্তর পেতে চলে যাও ১০ মিনিট স্কুল ফোরামে! আমার একটি প্রশ্ন আছে
হিটলার ছিলেন তার বাবার তৃতীয় স্ত্রীর তৃতীয় সন্তান। ছেলেবেলা থেকেই হিটলার ছিলেন, একগুয়ে, জেদী আর রগচটা। সামান্য কারণেই রেগে উঠতেন। অকারণে শিক্ষকদের সঙ্গে তর্ক করতেন। পড়াশুনার চেয়ে বেশি ছবি আঁকা ভালোবাসতো। মা মারা গেলে সংসারের সব বন্ধন ছিন্ন হয়ে গেল। ভাগ্য অন্বেষণে বেরিয়ে পড়লেন হিটলার। জীবনের শেষ পর্যায়ে তিনি সুইসাইড করেন। তিনি চেয়েছিলেন সমস্ত মানবজাতিকে ধ্বংস করতে, নিজের অপরিণামদর্শিতায় শেষ পর্যন্ত নিজেই ধ্বংস হয়ে গেলেন।

আলবার্ট আইনস্টাইন
জার্মানির একটি ছোট শহরে উলমে এক সম্পন্ন ইহুদি পরিবারে আইনস্টাইনের জন্ম হয় (১৮৭৯ সালের ১৪ই মার্চ)। পিতা ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার। মাঝে মাঝেই ছেলেকে নানান খেলনা এনে দিতেন। শিশু আইনস্টাইনের বিচিত্র চরিত্রকে সেই দিন উপলব্ধি করা সম্ভব হয়নি তাঁর অভিভাবক, তাঁর শিক্ষকদের। স্কুলের শিক্ষকদের কাছ থেকে মাঝে মাঝেই অভিযোগ আসত। পড়াশুনায় পিছিয়ে পড়া ছেলে, অমনোযোগী আনমনা। তার একমাত্র সঙ্গী ছিলেন তার মা। তাঁর কাছে দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ শিল্পীদের নানান সুর শোনেন। আর বেহালায় সেই সুর তুলে নেন। তারা ইহুদি ছিলেন কিন্তু স্কুলে ক্যাথলিক ধর্মের নিয়মকানুন মেনে চলতে হত।

পনেরো বছর বয়সের মধ্যে তিনি কান্ট, স্পিনোজা, ইউক্লিড, নিউটনের রচনা পড়ে শেষ করে ফেললেন। বিজ্ঞান, দর্শনের জন্যে পড়তেন গ্যেটে, শিলার, শেকস্পিয়র। বিজ্ঞান জগতে ক্রমশ তার নাম ছড়ায় তার দেয়া আপেক্ষিক তত্ত্বের কারণে। শেষ জীবনে বিশ্বশান্তির জন্যে খসড়া লিখতে আরম্ভ করেন ইংরেজ মনীষী বাট্রান্ড রাসেলের অনুরোধে, কিন্তু শেষ করতে পারলেন না।

১৯৫৫ সালের ১৮ ই এপ্রিল তাঁর জীবন শেষ হল। তাঁর ইচ্ছা অনুসারে মৃতদেহ পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হয়।

নিউজ গার্ডিয়ান/এমএ/