‘তিন বেলা খাবার জোটে না, আমাগির কিসের ঈদ’

আসাদুজ্জামান সরদার:

‘তিন বিলা তিন মুঠো খাবার জোটে না, আমাগির কিসের ঈদ। ঘূর্ণিঝড় আম্পানে ঘরের টিনের চাল উড়িয়ে নিয়ে যায়। পরে কপোতাক্ষ নদীর কুড়িকাহুনিয়ার বাঁধ ভাঙি আমাদের ঘর-বাড়ি সব ভাসায় নিয়ে গেছে। প্রথম কয়দিন রাস্তার ওপর গরু ছাগলের সাথে থাকতাম। দুই মাসের বেশি সময় পার হুয়ি গেছে। এখনও বাড়ির উঠানে জোয়ার-ভাটা চলতিছে। থাকার জায়গা নেই। অসুস্থ স্বামী আর দুই ছেলেকে নিয়ে কুড়িকাহুনিয়া মহিলা মাদ্রাসায় থাকি। রোজার মাসে ফিতরার কিছু টাকা পেয়েছিলাম। সেটা দিয়ে অসুস্থ স্বামীর চিকিৎসা করেছিলাম। রোজার ঈদে কোনও কিছু জুটিনি। খাওয়া হয় না ঠিকমতো। কোনও বেলায় কিছু জুটলে কিছু খাই, না জুটলে পানি খেয়ে দিন কাটায়ে দেই। এই ঈদেও মনে হয় না কিছু জোটবে। এই এলাকার অধিকাংশ মানুষ পানিতে ভাসতিছে। অনেক চিষ্টা করিও বাঁধ দিতি পারিনি। আমাদের আবার কিসের ঈদে। আমরা এতদিন ধরি পানিতে ভাসতিছ আমাগির কষ্ট কেউ দেখতি পায় না। বাথরুমে পর্যন্ত যাবার জায়গা নেই। বাথরুম করার জন্য সন্দি (সন্ধ্যা) পর্যন্ত অপেক্ষা করতি হয়। আপনারা ঈদ করেন…’ কথাগুলো একদমে বলতে বলতে হাউমাউ করে কান্না শুরু করলেন আশাশুনির প্রতাপনগরের কুড়িকাহুনিয়া এলাকার মঞ্জিলা খাতুন (৪৫)। শুধু মঞ্জিলা নয়, তার মতো একই অবস্থা অনেক পরিবারের।

আশাশুনির শ্রীউলা ইউনিয়নের মাড়িয়ালা গ্রামের দিন মুজুর জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘চারিদিক পানি ছিল সে কারণে রুজার ঈদের নামাজ পড়তি পারিনি। এবারও পড়তি পারবো কিনা জানি না। দুই মাসের বেশি সুময় (সময়) ধরি আমরা পানি ভাসতিছি (ভাসছি)। বাড়ি ঘর কিছু নেই। অনেক মানুষ এলাকা ছাড়ি চলি যাতিছে। ঈদ তো আমাগির জন্য না। চেয়ারম্যান মেম্বরা অল্প কিছু চাল, ডাল দেয় তাই খায়ি বাঁচি (বেঁচে) আছি। চারিদিন পানিতে ডুবুনে (ডুবে আছে) আবার করোনায় কাম-কাজ কিছু নেই। খায়ি না খায়ি কোনোরকম দিন কাটি যাতিছে। আমরা যে কি অসহায় জীবন যাপন করতিছ তা বলার ভাষা নেই। আগে কোরবানি ঈদে গরুতে ভাগি হতাম। এবার ঈদের সেমাই কিনতে পারিনি। খাওয়া হচ্ছে না ঠিকমতো ছেলে-মেয়েগের কিছু কিনে দেবো কি করি।’

শ্যামনগর উপকূলের গাবুরা, পদ্মপুকুর এবং বুড়িগোয়ালিনী মানুষের মধ্যে ঈদের আনন্দ নেই। উপকূলী মানুষ অধিকাংশ সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল। জুলাই থেকে বনে যাওয়া নিষেধ।

শ্যামনগর উপকূলের সাইদুল গাজী, গাজী বাদশাসহ গাবুরা ইউনিয়নের বেশ কয়েকজন জেলে বাওয়ালি বলেন, ‘আমরা পানিবন্দি এলাকার মানুষ। এবার ঈদ করতে পারবো না। গত বছর পানিবন্দি উপকূলের মানুষ কুরবানিতে শেয়ার ছিলাম। তবে এ বছর অধিকাংশ মানুষ কুরবানিতে শেয়ার থাকতে পারছে না।’

গাবুরা ইউনিয়নের আবুল হাসান বলেন, ‘সাতক্ষীরা উপকূলের মানুষের একমাত্র আয়ের উৎস বাগদা, গলদা, মাছ, কাঁকড়া ইত্যাদি সেটিও বন্ধ। পানিবন্দি উপকূলে শিশুদের এই ঈদে নতুন জামা কিনে দেওয়ার মতো সক্ষমতা নেই।’

গাবুরা ৯নং সোরা এলাকার বেশ কিছু জেলে বলেন, ‘আমরা এবার ঈদ করতে পারবো না। গত বছর আমরা গরু কুরবানিতে শেয়ার ছিলাম। এবছর আর আমরা কুরবানি করতে পারছি না। আমাদের একমাত্র আয়ের উৎস সুন্দরবনে মাছ, কাঁকড়া ধরা। সেটিও বন্ধ। কী খেতে দেবো বাচ্চাদের ঠিক নেই। এ ঈদে নতুন কাপড় কিনে দেওয়ার সক্ষম নেই। কী হবে আমাদের।’

স্থানীয়রা আরও বলেন, ‘আমাদের ঈদ আনন্দ নেই। আম্পান লোনা পানিতে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। সেই সাথে নদীতে মাছ, কাঁকড়া ধরা নিষিদ্ধ করে দিয়েছে। তেমনি ডুবে আছি আম্পানের বাঁধভাঙা পানিতে।’

বুড়িগোয়ালিনী এলাকার হানিফ গাজী, সাজাহান সরদারসহ আরও কয়েকজন জেলে বলেন, এবারের ঈদ আনন্দ আমাদের কপালে নেই। একদিকে আম্পান তছনছ করে দিয়েছে সব। সেইসঙ্গে নদীতে মাছ, কাঁকড়া ধরা নিষেধ। কী করে হবে আমাদের ঈদ।

গাবুরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাসুদুল আলম বলেন, সরকারিভাবে সুন্দরবনে মাছ শিকার বন্ধ আছে ১ জুলাই থেকে আগস্ট পর্যন্ত। সরকারিভাবে এই জেলে বাওয়ালিদের জন্য ৮৬ কেজি করে চাল বরাদ্দ হয়েছে। যাদের জেলের কার্ড আছে তারাই কেবল চাল পেয়েছেন।’

তিনি আরও বলেন, করোনায় মানুষের কাজ নেই। কিছু সরকারি-বেসকারি সাহায্য পেয়েছে। মোবাইল নম্বর ভুল হওয়ায় কিছু বাকি আছে। তারপরও আমার ইউনিয়নে মানুষ বর্তমান সময় খুব কষ্টে দিন কাটাচ্ছে। ঈদুল আজহা সবাই পালন করলেও এই এলাকার মানুষের মনে ঈদ আনন্দ নেই।

বুড়িগোয়ালিনী ইউপি চেয়ারম্যান ভবতোষ কুমার মন্ডলের বলেন, ‘মাছের প্রজননের কারণে মাছ শিকার বন্ধ আছে ১ জুলাই থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত। তবে সরকার এই জেলে বাওয়ালিদের জন্য ৮৬ কেজি করে চাল দিয়েছে। আমার ইউনিয়নের জেলে বাওয়ালিদের বর্তমান সময় খুব কষ্টে দিন যাচ্ছে। আমরা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুধু চাল দিচ্ছি। তবে এই জেলেরা বাজার সওদা কোথায় পাবে? তাছাড়া সামনে ঈদুল আজহা। এই ঈদে জেলেদের ঈদ আনন্দ হবে না।’

প্রতাপনগর ইউপি চেয়ারম্যান জাকির হোসেন বলেন, ঘূর্ণিঝড় মে মাসের ২০ তারিখে আঘাত হানলেও আমার ইউনিয়নের অধিকাংশ মানুষ পানিবন্দি আছে। এখানকার মানুষ কী কষ্টে আছে সেটা দেখার কেউ নেই। আম্পানে ক্ষতিগ্রস্থ ৫ হাজার ৯৫০ পরিবারের মাঝে ১০ কেজি করে সরকারি চাউল বিতরণ করা হয়েছে।

আশাশুনি উপজেলা নির্বাহী অফিসার মীর আলিফ রেজা বলেন, উপজেলার ৫৯ হাজার পরিবারের মাঝে ১০ কেজি করে চাল দেওয়া হয়েছে।

বুড়িগোয়ালিনীর নুর ইসলাম সানা বলেন, ‘এমনিতেই তো ডুবে আছি আম্পানের বাঁধভাঙা লোনা পানিতে। সঙ্গে আছে করোনা। আমরা যাবো কোন দিকে?’

শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার আ ন ম আবুজর গিফারী বলেন, উপজেলার ৭৯ হাজার ৯৭টি পরিবারকে ১০ কেজি করে চাল দেয়া হয়েছে। নিম্নবিত্তদের জন্য এবার বিশেষভাবে ১৮টি বিভিন্ন সংস্থা থেকে কোরবানি করে মাংস বিতরণ করা হবে। আশ্রয়ন প্রকল্পের মানুষের কোরবানির মাংস এবং আম্পানে দুর্গতদের মাঝেও মাস বিতরণ করা হবে। সূত্র: বাংলাট্রিবিউন

নিউজ গার্ডিয়ান/ এমএ/