জীবন থেকে সাত বছর আগে ঈদ চলে গেছে: ন্যানসি

শুরুতেই বলি, আমার প্রিয় খাবার গরুর মাংস। আর এই মাংসটাই ভালো রান্না করতে পারি। আমার দুই মেয়ে রান্না করতে পছন্দ করে। মজার বিষয় হলো— আমার পাঁচ বছরের মেয়েটাও জানে কীভাবে কোনটা রাঁধতে হয়। বড় মেয়ে রোদেলার বয়স ১২ বছর। এবার ঈদে গরুর মাংসের কালো ভুনা রোদেলা রান্না করবে- আগেই বলে রেখেছে।

ছেলেবেলায় রান্না করার প্রতি আগ্রহ ছিল না। সবসময় গান আর নাচ ছিল আমার পছন্দের তালিকায়। এদিক থেকে আমার দুই মেয়েই খুব সংসারী। আমার মনে হয়, আমি যদি সংগীতশিল্পী না হতাম তবে জীবনে আর কিছুই হতে পারতাম না। কারণ অন্য কোনো গুণ আমার নেই। আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা গান গাইতে পারবো। তবে হ্যাঁ, বিয়ের পর আমি রান্নার দিকে কিছুটা ঝুঁকেছি। কারণ খেতে তো হবে! সব মিলিয়ে ৫-৬টি রান্না ঠিকঠাকমতো পারি। জানি, এসব গর্ব করে বলার বিষয় নয়। আমি লজ্জা পেয়েও কথাগুলো স্বীকার করছি।

আগে মনে হতো, রান্না শুধু মেয়েদের বিষয়। কিন্তু আসলে তা নয়। এটি একটি শিল্প। রান্না কমন একটি বিষয়। বেসিক কিছু রান্না সবারই জানা উচিত।

১৯৯৭-৯৮ সালের কথা। আমি তখন ক্লাস ফাইভে পড়ি। ওই সময়ে পাঁচশ টাকার অনেক দাম। ঈদের সময় আব্বা পাঁচশ টাকা দিতেন। তখন খুঁজে পেতাম না টাকা দিয়ে কী করবো! বান্ধবীদের মধ্যে আমি লিডার ছিলাম। কোথাও ঘুরতে বের হলে খরচের দায়িত্ব থাকতো আমার ওপর। ছোটবেলা থেকে গান করতাম। যে কারণে বন্ধু মহলে আলাদা একটা জায়গা ছিল। বন্ধবীদের বলতাম, কী খাবি খা, আমার কাছে টাকা আছে। অন্যরকম একটা ভাব ছিল। এখন এতো টাকা আয় করি কিন্তু ওই পাঁচশ টাকার আমেজ আর পাই না।

কোরবানির ঈদে গরু কেনার জন্য কখনো বাজারে যাওয়া হয়নি। ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার মধ্যে আমার কোনো ভাগ ছিল না। উৎসব মানে উৎসব। আর উৎসব এলেই আমাকে নতুন জামা-কাপড় দিতে হবে। সেটা পূজা, বৈশাখ কিংবা নতুন বছর হলেও। বাবা-মার এক মেয়ে ছিলাম, যে কারণে যথেষ্ঠ আদরে বড় হয়েছি। মধ্যবিত্ত পরিবার সীমিত আয়ে জীবনযাপন করে। সীমিত আয়ের সংসারে বাবা-মার কাছে যখন যা চেয়েছি পেয়েছি। তবে হ্যাঁ, আমি কোরবানি করতে দেখতে পারি না। ভয় পাই। ছোটবেলায় গরু জবাই করতে দেখে খুব ভয় পেয়েছিলাম। ওই ভয়টা অনেক দিন আমার মনে ছিল। কোরবানির পশু কিনে বাসায় আনার পরও আমি ধারে কাছে যাই না। কোরবানি মানে ত্যাগ। অর্থাৎ যে প্রাণীর উপর মায়া থাকবে সেটাকে ত্যাগ করা। কিন্তু আমার কেন যেন এই দৃশ্য সহ্য হয় না।

আব্বা দ্বিতীয় বিয়ে করার পর প্রথম যে ঈদ জীবনে এসেছিল, সেটি ছিল বেদনাদায়ক ঈদ। ২০০৪ সালে আব্বা বিয়ে করেন। বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো ঘটনা ছিল। কারণ এমন ঘটনা ঘটবে সে জন্য আমরা কেউ প্রস্তুত ছিলাম না। আমার বয়স তখন ১৪ বছর। বাড়ন্ত বয়স। ওই সময়ে আব্বার চলে যাওয়া, আলাদা সংসার করা। বেশ কিছু দিন আব্বা আমাদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ রাখেননি। এই সময়ে অর্থনৈতিক ও মানসিক চাপে পড়ে গিয়েছিলাম। হঠাৎ অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হলো। এই দুঃসহ স্মৃতিগুলো ভুলতে পারি না।

আম্মা মারা গেছেন। বড় ভাই বিয়ে করে সংসার করছে। ঈদ এলে আমার এখন কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। যেহেতেু আম্মা নেই সুতরাং মায়ের বাড়িও নেই। ঈদ এলেই মেয়েদের বাবার বাড়ি যাওয়ার একটা প্রবণতা থাকে। ঈদের দিন কিংবা ঈদের পরের দিন বাবার বাড়ি মেয়েরা চলে যায়। কখনো কখনো বাবার বাড়িতেই ঈদ করে। অথচ আমি করতে পারি না। তাই ঈদে খুব অসহায় লাগে, খুব কষ্ট দেয়।

আব্বার সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ কম হয়। মাঝে মাঝে ফোনে কথা হয়। দুই ধরনের যন্ত্রণা অনুভব করি। এক আম্মা বেঁচে নেই। দুই আব্বা বেঁচে থেকেও নেই। আমার জীবন থেকে সাত বছর আগে ঈদ চলে গেছে। ঈদ এখন একদমই রঙিন লাগে না। সূত্র: রাইজিংবিডি

নিউজ গার্ডিয়ান/ এমএ/