ভ্রমণ পিপাসুদের হাতছানি দিয়ে ডাকে ঘুরগার বিল

নামটি শুনে মনে হতে পারে ঘুরগা জাতীয় স্থানীয় নামকরণ করা এক প্রকার কীটপতঙ্গ বুঝি এই বিলে চাষ করা হয়। যে কেউ প্রথমবার নাম টি শুনলে মনে রাখা সহজ হবে না। এর নামকরণ নিয়ে স্থানীয় লোক মুখে প্রচলিত তথ্য ছাড়া বস্তুনিষ্ঠ কোন সঠিক তথ্যও পাওয়া যায় না।স্থানীয় লোক মুখে শুনা যায় নানা রকম মৌখিক ভাষ্য নামকরণ নিয়ে। যেমন, স্থানীয় কয়েকজন প্রবীণ লোক বলেন ঘুরগা জাতীয় স্থানীয় নামকরণ এক ধরনের পোকা এই বিলের ফসলি জমিতে বেশি পরিমান দেখা যেত তাই সুপ্রাচীন কাল হতে এই জনপদের মানুষ এই বিলটি কে এই নামে ডাকতে থাকে, যা আজও মানুষ এই নামেই ডাকে। স্থানীয় গ্রামবাসীর নিকট এ বিল তাদের জীবন-জীবিকার একমাত্র মাধ্যম, বহিরাগতদের কাছে এটি প্রাকৃতিক সম্পদে পূর্ণ এক নয়নাভিরাম পর্যটন স্পট বা সাধারণের নিকট এটি শুধুই একটি বিল।

গত ১২ আগস্ট এই বিল নিয়ে Uno Chandina ফেইসবুকে জনাব স্নেহাশীষ দাশ,উপজেলা নির্বাহী অফিসার চান্দিনা, কুমিল্লা, #ঘুগরা_বিল – নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার এই শিরোনামে একটি পোস্ট করেন- “ঐতিহাসিক এ বিলের অবস্থান চাঁদপুরের কচুয়া, কুমিল্লার চান্দিনা ও দাউদকান্দির মধ্যবর্তী অঞ্চলজুড়ে যার ভৌগলিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম। কথিত আছে, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সরাসরি হেলিকপ্টারযোগে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে এ বিল সরেজমিন পরিদর্শন করেছিলেন। উদ্দেশ্য, দেশের প্রেক্ষাপটে এ বিলের অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা যাচাই। কিন্তু, ৭৫’ এর নির্মম ঘটনার প্রেক্ষিতে পরবর্তীতে গৃহীত পদক্ষেপসমূহের আর কোন দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। অথচ এটি হতে পারতো দেশের মানুষের জন্য এক আকর্ষণীয় পর্যটন স্পট কিংবা প্রান্তিক জনগোষ্ঠির অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। গড়ে উঠতো পাখি ও জলজ প্রাণীদের এক নিরাপদ আবাসস্থল।সরকারী-বেসরকারী মালিকানা মিলে এ উম্মুক্ত বিলের আয়তন প্রায় শত একরের কাছাকাছি।

এ বিলে প্রায় ৫০-৬০ রকমের দেশি প্রজাতির মাছ পাওয়া যায়। আরো রয়েছে সাপ, ব্যাঙসহ বিবিধ প্রজাতির জলজ প্রাণী ও মৌসুমি পাখির অবাধ বিচরণ। প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে উঠা লাল ও সাদা প্রজাতির শাপলা এ বিলের সৌন্দর্যকে বহুগুণে বৃদ্ধি করেছে। পানিতে নিমজ্জিত আছে বিভিন্ন প্রজাতির আকর্ষণীয় শৈবাল, কচুরিপানাসহ হরেক রকমের জলজ উদ্ভিদ। ভোরের দিগন্তবিস্তৃত বিস্তীর্ণ জলরাশি ও ফুটন্ত শাপলার অপরুপতা সৌন্দর্য পিপাসুদের মনকে দোলা দিয়ে যায়। শুস্ক-বর্ষা মিলে বছরে দুবার এখানে ধানের ফলন হয়। তবে, সারা বছর জুড়ে মাছ ধরা এ অঞ্চলের মানুষের অন্যতম প্রধান পেশা। একমাত্র পরিবহন মাধ্যম হিসেবে ডিঙ্গি নৌকার অবাধ বিচরন ঘুরতে আসা পর্যটকদের নজর কাড়বেই।

সাম্প্রতিক সময়ে কিছু লোভী ব্যক্তি/ভূমিখেকোর অবৈধ কর্মকান্ড এ বিলের স্থায়ী সৌন্দর্যকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। স্থানীয় কতিপয় ব্যক্তির অপরিকল্পিত আবাসন এ বিলের নয়নাভিরাম সৌন্দর্যকে ম্লান করছে। পাশাপাশি চলছে বাঁধ দিয়ে ব্যক্তিগত মৎস্যখামার নির্মাণ, অবৈধ বালু উত্তোলন ও মাটি কাটার হিড়িক। এ অপকার্যসমূহ গুরগার বিলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও এর অখন্ডতাকে বহুলাংশে গ্রাস করছে। নষ্ট হচ্ছে এর প্রাগৈতিহাসিক জীববৈচিত্র্য। মানুষের অবাধ আনাগোনা ও নির্বিচার ধ্বংসযজ্ঞ এ বিলের প্রাকৃতিক আধারকে বিনষ্ট করছে।

আশেপাশের অনেকগুলো খালের সাথে এ বিলের রয়েছে নিবিড় সংযোগ। একে কেন্দ্র করে নিরাপদ অভয়াশ্রম গড়ে তুলতে পারলে গুরগার বিলের পূর্বের রূপ অনেকাংশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। দেশি প্রজাতির মাছের প্রজনন মৌসুমে প্রশাসন কর্তৃক কঠোর বিধি নিষেধ আরোপ (প্রয়োজনে ঐ সময়ে মানুষের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি) করতে পারলে মাছের উৎপাদন বহুগুন বাড়ানো সম্ভব। পাশাপাশি মানুষের অবাধ বিচরণ নিয়ন্ত্রণ করলে বাড়বে মৌসুমি পাখির আনাগোনা। প্রাণ ফিরে পাবে এ বিস্তীর্ণ জলাধারের জলজ উদ্ভিদসমূহ। সরকারি-বেসরকারি মেগাপ্রজেক্ট গ্রহণের মাধ্যমে গড়ে তোলা যেতে পারে এতদঅঞ্চলের মানুষের বিনোদনের জন্য অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন স্পট। বাড়বে সরকারের রাজস্ব আদায়ও।

ইতোমধ্যে উপজেলা প্রশাসন, চান্দিনা ও মৎস্য বিভাগ কর্তৃক এ বিলের সরকারি স্থানসমূহ পুনঃখননের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, সরকারিভাবে অবমুক্ত হয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির মাছের পোনা। এতে বাড়বে মাছের উৎপাদন। অবৈধভাবে বসানো ড্রেজারসমূহ মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে ধ্বংসসহ জড়িতদের শাস্তির আওতায় আনা হচ্ছে। অপরিকল্পিত আবাসন বন্ধ রাখতে স্থানীয়দের সচেতন করা হচ্ছে।
পরিশেষে বলা যায়, সকলের সক্রিয় অংশগ্রহণ, অসাধু ব্যক্তিদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা, জনসচেতনতা সৃষ্টিসহ স্থানীয়দের বিকল্প কর্মসংস্থান বাড়াতে পারলে আবারো প্রাণ ফিরে পাবে জাতির পিতার অসমাপ্ত এ স্বপ্নের প্রকল্প। দল, মত নির্বিশেষে সকলের সমন্বিত প্রচেষ্টায় আবারো প্রাণ ফিরে আসুক ঘুরগার বিলের প্রাচীনএ জনপদে-এ প্রত্যাশা রইলো।”

স্যার এই বিলে সম্পর্কে সঠিক তথ্য দিয়ে চান্দিনা উপজেলা সহ দেশের সকলের নিকট ভবিষ্যতের একটি সম্ভাবনাময় গ্রামীণ পর্যটন কেন্দ্রের ও জাতির জনকের অসমাপ্ত স্বপ্নের প্রকল্পের কথা পৌঁছে গেছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ করা বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুদৃষ্টি কামনা করছি, যাতে করে জাতির পিতার অসমাপ্ত এ স্বপ্নের দ্রুত বাস্তবায়ন হয়। চান্দিনা উপজেলা সহ বৃহত্তর উত্তর কুমিল্লাবাসীর প্রাণের দাবি, জাতির অসমাপ্ত এ স্বপ্নের প্রকল্পের( ঘুগরা বিলে) দ্রুত বাস্তবায়ন।

লেখক: মোঃ খোরশেদ আলম, চান্দিনা, কুমিল্লা।

নিউজ গার্ডিয়ান/ এমএ/