অটোমান এম্পায়ার ও আগামীর তুরস্ক

রিয়াজুল ইসলাম রিয়াজ

রিয়াজুল ইসলাম রিয়াজ:

ঐতিহাসিকভাবে আধুনিক তুর্কি সাম্রাজ্য অটোমান সাম্রাজ্য নামে বিশ্বব্যাপী পরিচিত।। এই সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা পুরুষ ছিলেন উসমান গাজীর পিতা আরতুগ্রুল গাজী।। ১২৯৯ সালে তুর্কি বংশোদ্ভূত প্রথম ওসমান রোমের সেলযুক সাম্রাজ্য কতৃক রাজ্যশাসনের দায়িত্ব লাভ করেন। প্রথম দিকে রোমের প্রতি পূর্ণ আনুগত্য থাকলেও সেলযুক সাম্রাজ্যের ক্রান্তিলগ্নে প্রথম ওসমান স্বাধীনতা ঘোষণা করে বসেন এবং ধীরে ধীরে একটি বৃহৎ সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। অটোমান রাজা প্রথম মুরাদ কতৃক বলকান জয়ের মাধ্যমে এই সাম্রাজ্য বহু মহাদেশীয় সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি পায়। এর পরবর্তীতে ১৪৫৩ সালে সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মদ কন্সটান্টিনোপল জয় করার মাধ্যমে ওসমানীয়রা বাইজান্টাইন এম্পায়ারের উচ্ছেদ ঘটায়। বিগত শতাব্দীর শুরু হতে ওসমানীয় সাম্রাজ্য তথা অটোমান এম্পায়ার অত্যন্ত সফলতার সাথে তামাম আরব দুনিয়া ও ইউরোপের বৃহৎ ভূখণ্ড খিলাফতের অধীনস্থ করেছে। প্রাচীণ এ তুর্কি জাতির অস্থিমজ্জায় যে ধরনের রাজনৈতিক অহম স্থায়ীভাবে সৃষ্টি হয়েছে তা সুপ্রাচীণ পারস্য সভ্যতা ছাড়া খুব কম জাতিগোষ্ঠীর মাঝে দেখা গিয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। ফলে তুর্কি জাতির ডিএনএ, যুদ্ধ, রাজনীতি, কূটনীতি, সাম্রাজ্য পরিচালনা ইত্যাদির অসাধারণ আভিজাত্য রন্ধ্রে—রন্ধ্রে মিশে আছে। আনুমানিক ১৯২১ সালে ওসামানী বা অটোমান সাম্রাজ্যের পুরোপুরি বিস্তার ঘটে। এ সময় পুরো সাম্রাজ্যের আয়তন দাঁড়ায় প্রায় ৫২ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানি, অস্ট্রিয়া,হাঙ্গেরির পর ওসমানী সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। মিত্র শক্তির জয়ের দ্বারা ওসমানী সাম্রাজ্য ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। জন্ম নেয় নতুন নতুন রাষ্ট্রের। ১৯২৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কারসাজিতে তুরস্ক ১০০ বছর মেয়াদি এক চুক্তিতে জড়িয়ে পড়ে, ইতিহাসে যা ‘লুজান’ চুক্তি নামে পরিচিত। এই অন্যায্য চুক্তির বলে মহান তুর্কি জাতি রাতারাতি দাসে পরিণত হয়। তাদের সোনালী সময়ের অবসান ঘটে নিক্ষিপ্ত হয় শয়তানের গহবরে। এই লুজান চুক্তিতে ৫টি বিশেষ ধারা বেঁধে দেয়া হয়। এই আলোচনায় ধারাগুলোর বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে।

ধারা—(০১)– খেলাফত ব্যবস্থা। এই ধারার আইনের বলে ইসলামি খেলাফত ব্যবস্থার পুরোপুরি বিনাশ ঘটে। ওসমানী সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারীরা গুপ্ত হত্যার শিকার হোন। তাদের সকল সম্পদ বাজেয়াপ্ত হয়ে পশ্চিমে চলে যায়।।

ধারা—(০২)– ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র। এই ধর্ম নিরপেক্ষতার বুলি ছিল মূলত তুর্কি জাতিকে কৌশলে ইসলাম থেকে বিচ্যুত করে দেয়া।। স্বাধীন ধর্ম চর্চার স্থান সেখানে বিন্দুমাত্র রাখা হয়নি। বরং ধর্ম নিরপেক্ষতার নাম করে ইসলাম ধর্মকে গলা টিপে হত্যা করা হয়। ইউরোপীয় লাইফ স্টাইল, কালচার তাদের মননে, মগজে চাপিয়ে দেয়া হয়। আরবিতে আজান নিষিদ্ধ করা হয় যা ধর্ম নিরপেক্ষতা টার্মের সাথে সম্পূর্ণ কন্ট্রাডিক্ট। কামানের মুখে কোরআন পুড়িয়ে দেয়া, মসজিদ গুলো জোর পূর্বক দখল করে থিয়েটার, ক্লাব, সিনেমা হল বানানো এমনকি বদলে দেয়া হয় প্রশাসনিক ভাষা। ফারসি ও আরবি চর্চা প্রতিস্থাপিত হয় ল্যাটিন ভাষা ও সংস্কৃতি দিয়ে। ফলে সুপ্রাচীন এই বীরের জাতি হয়ে পড়ে একেবারে শিকড়হীন।নিজস্ব জাতিসত্তার স্বাতন্ত্র্য বিলোপের খেলায় পরিচয়হীন ও অস্ত্বিত্ব বিনাশের মধ্য দিয়ে আজকের এই তুর্কি জাতি যুগের পর যুগ অতিবাহিত করেছে।

ধারা—(০৩)— জ্বালানি উত্তোলনে নিষেধাজ্ঞা। বর্তমান পৃথিবীর অর্থনীতি মূলত পেট্রো ডলার নির্ভর। তুরস্ক নিজ দেশ অথবা অন্য কোনো দেশ হতে জ্বালানি উত্তোলন করতে গেলে তাদের উপর চুক্তি ভঙ্গের অভিযোগ এনে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করা হতে পারে। তাই তুরস্ক বসফরাস প্রণালি, কৃষ্ণ সাগর কোথাও জ্বালানি অনুসন্ধান করতে পারেনি এতদিন।।

ধারা—(০৪)— বসফরাস প্রণালী নিষেধাজ্ঞা। বিশ্বের সবচেয়ে সরু প্রণালী নাম হচ্ছে বসফরাস প্রণালী। এই প্রণালী বিশ্বের চারটি সাগরকে যুক্ত করেছে। ২০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বিশ্বের বাণিজ্যিক ও সামরিক আধিপত্য বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে বসফরাস প্রণালী। যা প্রায় ৬০০ বছর অটোমানদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। বর্তমানে বৈশ্বিক আধিপত্যের লড়াইয়ের কৌশলগত কেন্দ্রস্থল বসফরাস প্রণালী। তুরস্কের অধীনে থাকা বসফরাস প্রণালী কৃষ্ণ সাগর ও মারমারা সাগরকে যুক্ত করেছে। মারামারা সাগর, দারদান্যালিস প্রণালীর মাধ্যমে যুক্ত হয়েছে এজিয়ান সাগরে। আর এই এজিয়ান সাগর যুক্ত ভূমধ্যসাগরের সাথে। বসফরাস ও দারদান্যালিস উভয় প্রণালীরই অবস্থান তুরস্কের মধ্যে। কৃষ্ণ সাগরের তীরের দেশ রাশিয়া, ইউক্রেন, বুলগেরিয়া, রোমানিয়া এবং জর্জিয়ার বাণিজ্যিক ও যুদ্ধ জাহাজ গুলো ভূমধ্যসাগর ও অন্যান্য সাগরে প্রবেশের একমাত্র পথ বসফরাস প্রণালী। বসফরাস প্রণালীর উপর আধিপত্য বিস্তার নিয়ে কয়েক শতাব্দী ধরে চলেছে যুদ্ধ, সংঘাত। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ১৮৭৭—১৮৭৮ সালে অটোমান এম্পায়ার ও রাশিয়ার যুদ্ধ। পরবর্তীতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মিত্র বাহিনী দারদেন্যালিস প্রণালী তে আক্রমণ চালিয়ে ওসমানীয়দের বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।। খ্রিস্টপূর্ব ৫ম শতাব্দীতে গ্রীস এই প্রণালী দিয়ে কৃষ্ণ সাগরের উপকূলের দেশগুলোর সাথে বাণিজ্য পরিচালনা করতো। ২০০০ বছর আগে পারস্য সম্রাট ১ম দারিয়াস বসফরাস প্রণালী হয়ে অভিযান পরিচালনা করেন এবং পূর্ব ইউরোপের দানিয়ুব নদীর তীরে পৌঁছান। পারস্য, রোমান, বাইজান্টাইন, ওসমানীয় শাসনামল থেকে শুরু করে অদ্যাবধি পর্যন্ত বসফরাস প্রণালী নিয়ে বৃহৎ অনেক শক্তির মধ্যে লড়াই অব্যাহত রয়েছে। ১৪৫৩ সালের ২৯ মে ওসমানীয়রা কন্সটান্টিনোপল বা ইস্তাম্বুল জয় করে। বসফরাস প্রণালীর তীরে শক্তিশালী দুর্গ নির্মাণ করে অটোমানরা বিশ্ববাসীকে দীর্ঘমেয়াদি আধিপত্য বিস্তারের জানান দেয়। অটোমানদের দ্বারা ১৪৫৩ সালে কন্সটান্টিনোপল বিজয় ইতিহাসের বড় ধরনের বাঁক পরিবর্তনের অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়। এর মাধ্যমে অবসান ঘটে রোমান সাম্রাজ্যের সর্বশেষ ঘাঁটি বাইজান্টাইন এম্পায়ারের। এর পর থেকে প্রায় ৫০০ বছর ধরে বসফরাসের উপর নিরঙ্কুশ আদিপত্য বজায় থাকে ওসমানীয়দের। ওসমানীয় সাম্রাজ্য এক সময় পৌঁছে যায় ইউরোপের সার্বিয়া পর্যন্ত। এতে করে পুরো কৃষ্ণ সাগরেরও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হয় তাঁদের।

ওসমানীয়রা কৃষ্ণ সাগরের নাম দেন অটোমান লেক। ১৯ শতকের শুরু হতে অটোমান সাম্রাজ্য দুর্বল হতে শুরু করে এবং বসফরাস প্রণালী নিয়ে অনেক চুক্তি স্বাক্ষর হয় যার ফলে বিভিন্ন দেশ এই প্রণালী টি ব্যবহারের অনুমতি পায়। লুজান চুক্তিতে বসফরাসকে তুরস্কের ভূখণ্ডের অন্তর্ভুক্ত করে দেয়া হলেও এর উপর দিয়ে সকল ধরনের বানিজ্যিক ও যুদ্ধজাহাজ নির্বিঘ্নে চলাচলের অনুমতি পায়।। ১৯৩৬ সালে আরেক চুক্তিতে বসফরাসকে আন্তর্জাতিক শিপিং ল্যান হিসেবে ঘোষণা করা হয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তুরস্ক এই চুক্তির বিরোধিতা করে প্রণালী এলাকায় ব্যাপক সামরিকায়ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করে।।

ধারা—(০৫)— হেজাজ নিয়ন্ত্রণ। বর্তমান সৌদি আরবের নামকরণ হয়েছে মূলত সউদ বংশের নামানুসারে। যা ১৯৩২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর সূচনা লাভ করে। এর পূর্বে তামাম আরব ভূমি হেজাজ, নজদ, শাম,কুফা ইত্যাদি নামে পরিচিত ছিল। তবে হেজাজ বলতে শুধুমাত্র রেড সি’র বিপরীতে অবস্থিত পবিত্র ভূমি মক্কা,মদিনাকে বুঝায়।। এই মক্কা, মদিনা ও ছিল বীর তুর্কি জাতি অটোমানদের অধীনে। যদিও ওসমানীয়রা নিজেদেরকে আরবের শাসক না বলে খাদেম বলে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করতেন।। লুজান চুক্তি এই হেজাজের কতৃত্ত্ব কেড়ে নেয়।। আজও তুর্কিরা কাবা শরীফের গিলাফ ধরে কান্নাকাটি করেন, আল্লাহ যেন পুনরায় তাঁদের মক্কা, মদিনার খেদমতের সুযোগ দেন। হেজাজের তুর্কি নিয়ন্ত্রনের বিপরীতে পশ্চিমা মদদে সেটেলমেন্ট দেয়া হয় সৌদি রাজতন্ত্রের।। সৌদি আরব সহ মধ্য প্রাচ্যের দেশগুলোর অধিকাংশ প্রিন্স,বাদশাহ সবাই ভালো করেই জানে, পশ্চিমা মদদ ছাড়া তাঁদের মসনদ ১ দিনও স্থায়িত্ব পাবে না।। তাই একমাত্র কাতার ছাড়া মধ্য প্রাচ্যের সব দেশ গুলো ইন্দো ইসরাইল লবিতে সখ্যতা দেখাচ্ছে। কারণ বর্তমান বৈশ্বিক আধিপত্যের রাজনীতির খেলায় মধ্য প্রাচ্যের নিয়ন্ত্রণ ইরান ও তুরস্কের অধীনে চলে যাবার সমূহ সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।। যা কিনা আরব দুনিয়ার ধনতান্ত্রিক বিলাসী রাজতন্ত্রের জন্য হুমকি স্বরূপ।। তাই তারা সর্ব শক্তি নিয়ে তুরস্ক আর ইরানের উত্থান ঠেকাতে মরিয়া।। যাই হোক,, লুজান চুক্তি প্রায় শেষ হতে চলেছে। ১০০ বছরের জমাট বাঁধা পুঞ্জীভূত অন্ধকার ফেলে তুরস্ক কি পারবে অটোমান সাম্রাজ্যের দাপট পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে?? নাকি সেক্যুলারিজম বলবৎ থাকবে। আপাত দৃষ্টিতে মনে হচ্ছে তুরস্ক তার পূর্বের ভাবধারায় ফিরে যাবার সম্ভাবণা বেশি। কারণ এরদোয়ানের দল ক্ষমতায় আসার পর থেকে তুরস্কে নব্য ইসলামি জাগরণের জোয়ার লক্ষ্য করা গিয়েছে।। ন্যাটো থেকে বের হয়ে যাবার সম্ভাবণা উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না।। বিশ্বের পরাশক্তি হবার দৌড়ে তুরস্ক ইতিমধ্যে মার্কিন বিরোধী বলয়ে ঢুকে যাওয়ার প্রাণান্ত চেষ্টা চালাচ্ছে।। যদি তুরস্কের এই নীতি সফল হয় তাহলে আগামীর বিশ্ব রাজনীতির খেলায় তুরস্ককে সামনের সাঁড়ির নেতৃত্বে দেখা যাবে বলা যায়।।

লেখক: শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

নিউজ গার্ডিয়ান/ এমএ/