জোট সমীকরণের বৃত্তে মুসলিম বিশ্ব

রিয়াজুল ইসলাম রিয়াজ:

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মুসলিম বিশ্বের সম্পর্কের ভাঙ্গা গড়া চলছে তুমুল বেগে। এর সর্বশেষ শিকার পাকিস্তান সৌদি আরব বন্ধুত্ব। দু’দেশের ঐতিহাসিক সম্পর্কে বিচ্ছেদের সুর বেজে উঠেছে বলে অনুমান করা যাচ্ছে। ক্রমে ক্ষয় হতে যাওয়া এই বন্ধনকে এক বিন্দুতে আনতে পাকিস্তানের স্বশস্ত্র বাহিনীর প্রধান জেনারেল কামার জাভেদ বাজওয়া সম্প্রতি সৌদি আরব সফর করেন। বিস্ময়করভাবে তিনি সৌদ বংশের মূল ক্ষমতাধর প্রিন্স মুহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে সাক্ষাত পান নি। পাকিস্তানের মতো সামরিক সক্ষমতা সম্পন্ন দেশের জন্য এটা বিব্রতকর। এথেকে বুঝা যাচ্ছে সৌদি সরকারের পাকিস্তানের উপর ক্ষোভ জমেছে।। এমন পরিস্থিতিতে ইসলামাবাদ তার বিকল্প বন্ধুদের দিকে হাত বাড়াচ্ছে।। মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী দুই দেশের সম্পর্কের নানা দিক নিয়ে এখানে আলোচনা করব।।

সৌদি আরবের ক্ষোভের বড় কারণ ওআইসি নিয়ে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মাহমুদ কুরেইশীর বিবৃতি এবং ইরান, কাতার, তুরস্ক ও মালয়েশিয়ার সাথে ইমরান খানের সাম্প্রতিক ঘনিষ্ঠতা। পাকিস্তান, তুরস্ক, ইরান, কাতার মৈত্রীতে সৌদ বংশের হর্তাকর্তারা প্রচন্ড ক্ষুব্ধ। দীর্ঘদিন থেকে পাকিস্তান চাইছে কাশ্মির বিষয়ে ওআইসি বৈঠক ডাকুক। কিন্তু ওআইসির অন্যতম প্রধান দেশ সৌদি আরবের অনাগ্রহে সেটা হচ্ছে না।। তাই ইসলামাবাদ চাইছে ওআইসির অন্য আগ্রহী দেশ গুলোকে নিয়ে বৈঠক ডাকতে। কাশ্মির নিয়ে সৌদির এমন নিস্ক্রিয়তায় পাকিস্তানের ক্ষোভ ঊর্ধ্বে তুলেছে ও ওআইসির বিকল্প জোট গঠনে অনুপ্রেরণা দিয়েছে।।

সৌদি আরব মনে করছে পাকিস্তানের এই ক্ষোভ তুরস্ক, ইরানের ইন্ধনে হচ্ছে।। আঙ্কারার সঙ্গে ইমরান খানের নাটকীয় উষ্ণতায় সৌদি আরব সুখী নয়।। বলা হচ্ছে সৌদি আরবের সঙ্গে তেহরান, আঙ্কারার দ্বন্দ্বেরই বলি রিয়াদ– ইসলামাবাদ সম্পর্ক।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইমরান খানের স্ট্রাটেজিক পার্টনার কাতার, মালয়েশিয়াকে নিয়ে নতুন জোট গঠনের প্রয়াস। এই জোট বাস্তবায়ন হলে রিয়াদকে দীর্ঘমেয়াদে মুসলিম বিশ্ব হতে কোণঠাসা করে ফেলবে যা রিয়াদের ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।।

ইমরান খানের সাথে তুরস্কের খোলামেলা বন্ধুত্বের বেশ কড়া প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে সৌদি আরব। দেড় বছর আগে পাকিস্তানকে দেয়া অর্থ সাহায্য ফেরত চেয়ে রিয়াদ বার্তা দিয়েছে যে ইসলামাবাদের আচরণে তারা অসন্তুষ্ট। পাকিস্তান ও চীনের কাছ হতে জরুরী ভিত্তিতে অর্থ নিয়ে ১ বিলিয়ন ডলার ফেরত দিয়ে তাদের প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে।

পাকিস্তানের জন্য সৌদি আরব গুরুত্বপূর্ণ দেশ। সাহায্য, সহযোগিতার বিপুল উৎস ছাড়াও সৌদিতে রয়েছে পাকিস্তানের ৩০ লাখ প্রবাসী। অর্থনীতির এই দুঃসময়ে এই প্রবাসীরা পাকিস্তানের অন্যতম ভরসা।। তাই ইমরান খান বুঝে শুনে পদক্ষেপ নিতে চাইছে।। ক্ষমতাধর সেনা প্রধান কে রিয়াদ পাঠিয়ে ইমরান খান সম্পর্কের ছেদ ঘুচানোর চেষ্টা করলেও ফল একেবারে শূন্যই বলা যায়।। তবে বল কিছুটা ইমরানের হাতেও রয়েছে। কারণ সৌদি সামরিক জোটের প্রধান হিসেবে দায়িত্বে আছেন পাকিস্তানি জেনারেল রাহেল শরীফ।। পাকিস্তান তার সামরিক সাপোর্ট সৌদিতে বন্ধ করে দিলে রিয়াদকে জাতীয় নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হবে চরমভাবে।। সৌদির উপর বহুমাত্রিক নির্ভরতা সত্ত্বেও এই একটি সুযোগ নিয়েই ইমরান খান দোহা, তেহরান, আঙ্কারা জোটে প্রবেশ করেছেন।। এর পিছনের বল হিসেবে অর্থনৈতিকভাবে চীন ও রাজনৈতিক ব্যাকাপ হিসেবে তুরস্কের হাত রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।।

সৌদি আরবের রাগ, ক্ষোভ পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলবে এটা ইমরান খান ভালোভাবেই বুঝেছেন। ইমরানের বিরুদ্ধ রাজনৈতিক মাঠে এই ইস্যু যে জ্বালানী জোগাবে সেই ভয়েতে ইমরান খান গত বছর কুয়ালালামপুর সম্মেলনে যোগ দেন নি। কিন্তু এবার ভিন্ন কৌশলে চীনকে দিয়ে সেনা নিয়ন্ত্রণে সৌদি নাগপাশ হতে রাজনৈতিক শক্ত ভিত ও ইতিমধ্যে খুঁজে নিয়েছেন ইমরান খান। আর পাকিস্তানের রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর প্রভাব কতটুকু এটা সকলেই জানা। চীন ও পাকিস্তানের জেনারেল রা ইমরান খানকে রাজনৈতিক ব্যাকাপের প্রতিশ্রুতির ফলই বলা চলে তেহরান, দোহা, ইসলামাবাদ, আঙ্কারা জোট।

রিয়াদ–ইসলামাবাদের এই এই জটিলতায় চীন–ভারত প্রবলভাবে জড়িয়ে আছে।। কাশ্মির ইস্যুতে ওআইসির বড় নীরবতার কারণ হলো সৌদি আমিরাতের সাথে ইন্দো–ইজরাইল লবীর সখ্যতা।। সৌদি আরব চায় না ভারতকে ক্ষুব্ধ করে কাশ্মিরিদের পক্ষ নিয়ে ওআইসি থেকে কোনো বিবৃতি দিতে। কারণ সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরব ভারতের অন্যতম কৌশলগত মিত্রে পরিণত হয়েছে যার ফল পাকিস্তানের সাথে তাদের দীর্ঘদিনের সম্পর্কের চিড়।।

ওআইসি যে কাশ্মীর, প্যালেস্টাইন,রোহিঙ্গা,সিরিয়া ইস্যু নিয়ে আর ভাবতে চাইছে না তারই ছাপ রয়েছে আমিরাত–সৌদির বিদেশ নীতিতে। আপাতত ভারত, ইজরায়েল, যুক্তরাষ্ট্রকে গুরুত্ব দিয়ে যেকোনো মূল্যে বন্ধুত্ব স্থাপনের পক্ষে রিয়াদ–আবুধাবি। এভাবেই রিয়াদ, আবুধাবি, নয়াদিল্লি, তেলআবিব, ওয়াশিংটন মৈত্রী জীটের সমীকরণ গড়ে উঠেছে।।

মুসলিম বিশ্বের এই রাজনৈতিক বিভাজনের খেলায় চীন ও বসে নেই। যেহেতু ওআইসির বর্তমান নেতৃত্ব যুক্তরাষ্ট্র পন্থী সেহেতু চীনে কে বিকল্প জোট গড়ে মুসলিম বিশ্বে আধিপত্য ধরে রাখতে পাল্টা সমীকরণ দাঁড় করাতে হবে। যার স্পষ্টত রূপ ইরান,পাকিস্তান, তুরস্ককে দিয়ে শক্তিশালী আরেকটি মুসলিম জোটের জন্ম দেওয়া।।

অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, ইসলামি শক্তিধর এই দেশ গুলোর এই জোট জোট খেলার ভাঙ্গা৷ গড়ায় বেইজিং নিবিড়ভাবে জড়িয়ে গিয়েছে।। তেহরানের সাথে ৪০০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ চুক্তি ইরানকে ভারতের কাছ হতে ছিনিয়ে এনে নতুন ব্লকে যুক্ত করেছে।

পাকিস্তান, ইরান, চীন মৈত্রীকে মোকাবিলা করতে গিয়ে নয়াদিল্লি রিয়াদকে কাছে টানছে।। আর এই জিনিসটি ইমরান ও এরদোয়ানের জোট গঠন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করেছে।।

আফগান শান্তি চুক্তির মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাতার ও অক্সফোর্ড পলিটিশিয়ান খ্যাত ইমরান খানের ভূমিকা বিশ্ব রাজনীতির মাঠে দোহা—ইসলামাবাদ কে বড় খেলোয়াড়ে পরিণত করেছে।। আফগানিস্তানে যদি তালেবানদের প্রভাব বৃদ্ধি পায় তাহলে ইসলামাবাদ যে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক দাবার গুটি ঘুরিয়ে দিবে তা স্পষ্ট করেই বলা যায়। কারণ গত ১৯ বছরে তালেবানদের সাথে সন্ত্রাস বিরোধী খেলায় পাকিস্তান তালেবানকে সামরিক ও অর্থনৈতিক সাপোর্ট দিয়ে গিয়েছে।। তালেবান যখন ধ্বংসের দাঁড়প্রান্তে তখন ও রাওয়ালপিন্ডির জেনারেল রা তালেবানকে গোপনে লুকিয়ে থাকার ট্যাকটিস শিখিয়েছে। এটা তালেবান রা বেশ ভালো করেই জানে।। পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের চাপের পরেও তালেবানদের বিরুদ্ধে কোনো শক্ত সামরিক পদক্ষেপ নেয়নি।। বরং চোর পুলিশ গেইমের আড়ালে আফগানিস্তানে আশরাফ ঘানির বিপরীতে তালবানদের টিকিয়ে রেখেছে নিজ স্বার্থে।।

পেন্টাগনের প্রক্সি ওয়ারে ইতিমধ্যে বেইজিং স্থান করে নেওয়ায় মধ্য–প্রাচ্যের ভূ–রাজনৈতিক গুরুত্ব অনেকটা কমে এসেছে বলে ধরা হচ্ছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র মধ্য– প্রাচ্যের উপর তেলের জন্য আর আগের মতো নির্ভরশীল নয়। আর পেন্টাগনের বিপরীতে বেইজিংয়ের এই নাটকীয় উত্থান মুসলিম দেশ গুলোকে তাদের মুরুব্বি পরিবর্তনের সুযোগ করে দিয়েছে।। রিয়াদের– দোহার বিপরীতে আঙ্কারার– ইসলামাবাদ জোট এর দৃশ্যমান প্রমাণ।

তবে রিয়াদ যদি দীর্ঘমেয়াদে ইসলামাবাদের সাথে দূরত্ব বজায় রাখে এতে দুদেশেরই কিছু দূরবর্তী ঝুঁকি তৈরি করবে।। কারণ রিয়াদের উপর পাকিস্তানের যেমন অর্থনৈতিক নির্ভরতা রয়েছে তেমনি পাকিস্তানের উপর রিয়াদের রয়েছে ব্যাপক সামরিক নির্ভরতা।। রিয়াদ ইসলামাবাদকে যত দূরে ঠেলবে পাকিস্তান অস্তিত্ব রক্ষার্থে ততো বেশি তুরস্ক, ইরান ও কাতারের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলবে।। এখন ইসলামি দুনিয়ার এই জোট সমীকরণ বিশ্ব রাজনীতির মাঠে কে কতটা সফল হবে সেটা সময়ই বলে দিবে।।

লেখক: রিয়াজুল ইসলাম রিয়াজ- শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

নিউজ গার্ডিয়ান/ এমএ/