নারী নির্যাতন বন্ধে তরুণদের দুইটি পরিকল্পনা

আব্দুল্লাহ আল মাছুম:

করোনার এই সময়ে তরুণদের সামাজিক কাজে উৎসাহ দিতে ‘ব্রিটিশ কাউন্সিল বাংলাদেশ’ আয়োজন করে ‘পরিকল্পনা’ ছড়িয়ে দেওয়া প্রতিযোগিতা। শিরোনাম দেওয়া হয় ‘একটিভ সিটিজেনস কোভিড-১৯ রেসপন্স: সোস্যাল একশন ইনোভেশন আইডিয়াস কম্পিটিশন’।

মূলত বাংলাদেশ জুড়ে ‘একটিভ সিটিজেনস’ প্রজেক্টের আওতাধীন তরুণদের জন্য এই আয়োজন করা হয়। ৩০ জুন শুরু হওয়া প্রতিযোগিতা চলে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত। প্রতিযোগিতায় সেরা ১০টি আইডিয়া নির্বাচন করা হয়। তারমধ্যে বাছাই করা নারীদের জন্য দুইটি পরিকল্পনার কথা জানাচ্ছেন আব্দুল্লাহ আল মাছুম।

আরটিস্টস ফর চ্যাঞ্জ: করোনায় ঘরবন্দী পুরো বিশ্ব। উন্নত দেশগুলো যেমন স্থবির হয়েছে তেমনি স্থবির হয়েছে দরিদ্র দেশগুলোও। করোনার স্থবিরতা থেকে রেহাই পায়নি বাংলাদেশও। কিন্তু বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে আরো একটি সমস্যা প্রকট হতে দেখা গিয়েছে। বেড়েছে পারিবারিক নারী ও শিশু নির্যাতন। এই নির্যাতন বন্ধে সচেতনতা সৃষ্টিই কার্যকর সমাধান। সচেতনতা সৃষ্টির জন্য একদল তরুণ ভিন্নধর্মী উদ্যোগ নিয়েছে। তারা মনে করে একটি বিশেষ আলোকচিত্র সমাজে প্রভাব বিস্তার করতে পারে। তাদের মতে, শুধু করোনার সময়েই নয় বরং সবসময়ের জন্যই কার্যকর এই পদ্ধতি। কার্যক্রম বিষয়ে কথা বলেছেন ‘আরটিস্টস ফর চ্যাঞ্জ’- এর মেন্টর নাজমুন নাহার। নাজ বলেন, ‘আমাদের মেইন থিম হলো মেইক-আপের মাধ্যমে নারীর প্রতি হওয়া অবিচার গুলো ফুটিয়ে তোলা। মেইক আপ শুধু সাজসজ্জা না এটি একটি প্রতিবাদের ভাষা বলে আমরা বিশ্বাস করি। এই লক্ষ্যে আমরা করোনাকালীন সময়ে ফেইসবুক গ্রুপ এবং পেইজের মাধ্যমে কাজ করেছি। অসংখ্য নারী,পুরুষ আমাদের সাথে ঐক্যমত পোষন করে মেইক আপ করে ছবি আপলোড করেছে। প্রতিবাদ করেছে নারী সহিংসতা, নারী নির্যাতন, বাল্য বিবাহ রোধের মতো সেনসিটিভ ইস্যু গুলো নিয়ে।’

নাজমুন নাহারের কাছে প্রশ্ন ছিল, তাদের উদ্যোগের সফলতা তারা কীভাবে মূল্যায়ন করবেন। উত্তরে নাজ বললেন, ‘আমাদের সাথে দশ হাজারের অধিক স্বেচ্ছাসেবী কাজ করছে এবং যারা আমাদের কার্যক্রমের সাথে অংশগ্রহণ করেছে তাদের কনফার্মেশনে পেয়েছি। তারা নিজের এবং আশেপাশের পরিবারেও কথা বলেছে। এভাবে আমরা অসংখ্য মানুষকে আমাদের কার্যক্রম সম্পর্কে জানাতে এবং ঐক্যমত করতে সক্ষম হয়েছি।’

সোশ্যাল ক্যানভাসারস: সোশ্যাল ক্যানভাসারসের যাত্রা শুরু হয় ২০১৭ সালে। স্নাতক ও স্নাতকোত্তরের বিভিন্ন পর্যায়ে অধ্যয়ন করা শিক্ষার্থীরা এই দলের সদস্য। ‘সোশ্যাল ক্যানভাসারস’- এর প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল গণ পরিবহনে নারী নির্যাতন প্রতিরোধে সচেতনতা সৃষ্টি করা। সেজন্য তারা গণ পরিবহনে প্রচারণা চালানোর কার্যক্রম হাতে নেয়। যার স্লোগান হচ্ছে ‘অফিসে, ঘরে, যাত্রাপথে থাকবে নারী নিরাপদে’। সেই প্রচারণা কৌশলের সূত্র ধরেই ‘ক্যানভাসারস’ নাম ধারন করে।

এই দলটি মনে করে, নারী অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী না হওয়াই করোনায় নারী নির্যাতন বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। যদি নারী ঘরবন্দী থেকেও আয় করে তবে পারিবারিক নির্যাতন থেকে নারী মুক্তি লাভ করতে পারবে। সে সঙ্গে পরিবারে নারীর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে। পারিবারিক দৈন্যদশারও উন্নতি ঘটবে।

ঘরবন্দী থেকে আয় করার সবচেয়ে সহজ উপায় হচ্ছে হাতে বানানো গৃহস্থালি সামগ্রী বিক্রি করা। এই বেচাবিক্রির মাধ্যমে নারী হয়ে উঠবে উদ্যোক্তা। ‘সোশ্যাল ক্যানভাসারস’ এই পরিকল্পনা ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। আয়োজন করেছে রান্না বিষয়ক অনলাইন প্রশিক্ষণের। ‘সোশ্যাল ক্যানভাসারস’- এর অন্যতম সংগঠক মোঃ আমিরুল করিম মুসা বললেন, ‘যখন বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দায় চাকরি হারাচ্ছে নারীরা ঠিক তখনই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে কাজে লাগিয়ে কর্মহীন নারী হয়ে উঠতে পারেন উদ্যোক্তা। সোশ্যাল ক্যানভাসারস তাদের বিভিন্ন রকম হোম-মেইড ফুড, কেক এবং ফ্রোজেন ফুড তৈরি করার অনলাইন প্রশিক্ষণের আয়োজন করেছে। এর উদ্দেশ্য মূলত তাদের মেন্টরিং করার মাধ্যমে তাদের পরিশ্রমকে কাজে লাগিয়ে আয় করতে উদ্বুদ্ধ করা। এই প্রজেক্টটি নিয়মিত ব্যাচ আকারে সারা বছর পরিচালনা করার পরিকল্পনা রয়েছে।’

প্রতিযোগিতায় সেরাদের ক্রম নির্ধারন করা হয়নি। ব্রিটিশ কাউন্সিল করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় তরুণদের দশটি ‘পরিকল্পনা’কেই সাধুবাদ জানিয়েছে।

ক্যাপশন: ‘আরটিস্টস ফর চ্যাঞ্জ’ এ ধরনের প্রতীকি ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে নারী নির্যাতন বন্ধে সচেতনতা তৈরির চেষ্টা করছে।

লেখক: আব্দুল্লাহ আল মাছুম- শিক্ষার্থী, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, সাভার, ঢাকা।

নিউজ গার্ডিয়ান/ এমএ/