ঘুরে আসতে পারেন প্রত্নবস্তুর উয়ারী-বটেশ্বর

উয়ারী-বটেশ্বর বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নস্থান। নরসিংদী জেলার বেলাব উপজেলা থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার পশ্চিমে অবিস্থত দু’টি গ্রাম উয়ারী এবং বটেশ্বর। ধারণা করা হয় এটি মাটির নিচে অবস্থিত একটি দুর্গ-নগরী এবং বানিজ্য কেন্দ্র। বিশেষজ্ঞদের ধারণা অনুযায়ী এটি প্রায় আড়াই হাজার বছরের পুরনো। তবে ২ হাজার সালে আবিষ্কৃত কিছু প্রত্ন নিদর্শন পরীক্ষার প্রেক্ষিতে উয়ারীর বসতিকে খ্রিস্টপূর্ব ৪৫০ অব্দের বলে গবেষকরা বলছেন।

১৯৩০-এর দশকে স্থানীয় স্কুল শিক্ষক মুহম্মদ হানিফ পাঠান প্রথম উয়ারী-বটেশ্বরের প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব জনসমক্ষে তুলে ধরেন। পরবর্তী সময়ে তাঁর পুত্র মুহম্মদ হাবিবুল্লা পাঠান উক্ত স্থানের প্রত্নবস্তু সংগ্রহ ও গবেষণার কাজ শুরু করেন। দীর্ঘ দিন পর ১৯৯৬ সাল থেকে উয়ারী-বটেশ্বর অঞ্চলে প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপের কাজ সম্পন্ন করা হয় এবং ২০০০ সাল থেকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক সুফি মোস্তাফিজুর রহমান এর উদ্যোগে যথাযথ প্রক্রিয়ায় উৎখনন কাজ শুরু হয়।

এই পর্যন্ত এই স্থানটিতে আড়াই হাজার বছরের প্রাচীন দুর্গ-নগর, বন্দর, রাস্তা, পার্শ্ব-রাস্তা, পোড়ামাটির ফলক, মৃৎপাত্র, স্বল্প-মূল্যবান পাথর ও কাচের পুঁতি, মুদ্রা-ভাণ্ডার সহ উপমহাদেশের প্রাচীনতম ছাপাঙ্কিত রৌপ্যমুদ্রা আবিষ্কৃত হয়েছে।

এছাড়া পাওয়া যায়- বিষ্ণুপট্ট, ব্রোঞ্জের তৈরি ধাবমান অশ্ব, বিভিন্ন ধরনের পাত্র, রেলিক কাসকিট-এর ভগ্নাংশ, পাথরের বাটখারা, নব্যপ্রস্তর যুগের বাটালি, লৌহকুঠার, বল্লম, পাথরের তৈরি সিল, ত্রিরত্ন, কচ্ছপ, হস্তী, সিংহ, হাঁস, পোকা, ফুল, অর্ধচন্দ্র , তারকা, রক্ষাকবচ, পোড়ামাটির কিন্নর, সূর্য ও বিভিন্ন জীব-জন্তুর প্রতিকৃতি, রিংস্টোনসহ কয়েক সহস্র স্বল্প মূল্যবান পাথর ও কাচের গুটিকা।

উয়ারী-বটেশ্বরে প্রত্ন-বস্তু খননে প্রায় আড়াই হাজার বছরের প্রাচীন দুর্গ-নগর, বন্দর, রাস্তা, পার্শ্ব-রাস্তা, পোড়ামাটির ফলক, স্বল্প-মূল্যবান পাথর ও কাচের পুঁতি, মুদ্রা-ভাণ্ডারসহ উপমহাদেশের প্রাচীনতম ছাপাঙ্কিত রৌপ্যমুদ্রা আবিষ্কৃত হয়েছে। উল্টো-পিরামিড আকৃতির স্থাপত্যটি নিয়েও বিশেষজ্ঞ স্থপতিরা ইতোমধ্যে গবেষণা শুরু করেছেন।

এখানে পাওয়া চারটি পাথুরে নিদর্শন প্রত্নপ্রস্তরযুগের বলে কেউ কেউ মনে করে।

নব্যপ্রস্তর যুগের হাতিয়ার প্রাপ্তির আলোকে অনুমান করা হয়েছে যে, খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দের মাঝামাঝি সময়ে এগুলো এখানে ব্যবহৃত হয়ে থাকতে পারে। বিপুল পরিমাণ লৌহ কুঠার ও বর্শাফলকের সময়কাল এখনো নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি।

ছাপাঙ্কিত রৌপ্য মুদ্রাগুলো মৌর্যকালপর্বের বলে ধারনা করা হয়।

কাচের গুটিকাগুলো সম্ভবত খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতক থেকে খ্রিস্টীয় প্রথম শতক পর্যন্ত প্রচলিত ছিলো।

২০০৪ সালের মার্চ-এপ্রিলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. সুফি মোস্তাফিজুর রহমান এর নেতৃত্বে একদল প্রত্নতাত্ত্বিকের উৎখনের ফলে উয়ারী গ্রামে আবিষ্কৃত হয়েছে ১৮ মিটার দীর্ঘ, ৬ মিটার প্রশস্ত ও ৩০ সেন্টিমিটার পুরু একটি প্রাচীন পাকা রাস্তা। রাস্তাটি নির্মাণে ব্যবহৃত হয়েছে ইটের টুকরা, চুন, উত্তর ভারতীয় কৃষ্ণ মসৃণ মৃৎপাত্রের টুকরা, তার সঙ্গে রয়েছে ল্যাটারাইট মাটির লৌহযুক্ত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র টুকরা।

এদিকে উয়ারী দুর্গ নগরের বাইরে আরো ৫০ টি প্রত্নস্থান এ যাবত আবিষ্কৃত হয়েছে। আবিষ্কৃত প্রায় অর্ধশতাধিক প্রত্নস্থানের প্রত্নবস্ত্ত বিচারে ধরে নেয়া যায় যে, অধিবাসীরা ছিল কৃষিজীবী এবং এদের উৎপাদিত উদ্বৃত্ত ফসল নগরে বসবাসরত ধনিক, বণিক, পুরোহিত, কারিগর ও রাজকর্মচারীদের খাদ্য চাহিদা পূরণ করত।

উয়ারী-বটেশ্বরের অধিবাসীগণ উন্নত প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত ছিল। তারা ধাতু গলিয়ে মুদ্রা তৈরি করার প্রযুক্তি জানত এবং পুঁতির সঙ্গে রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করে অলংকার তৈরি করতে পারত। উত্তরাঞ্চলীয় কালো মসৃণ মৃৎপাত্রের সঙ্গে এ নগর সংস্কৃতির সম্পর্ক রয়েছে। কারণ উপমহাদেশে দ্বিতীয় নগর সভ্যতার প্রত্নস্থানগুলোতে উত্তরাঞ্চলীয় কালো মসৃণ মৃৎপাত্র পাওয়া যায়। সবমিলিয়ে বলা যায়, উয়ারী-বটেশ্বর ছিল একটি দুর্গ নগর, নগর বা একটি নগর কেন্দ্র এবং সমৃদ্ধ বাণিজ্য কেন্দ্র।

নিউজ গার্ডিয়ান/ ০১:৫৫/ এমএ/