“রস-রহস্য, রোমাঞ্চের ভিড়, এ যেন রুদ্রের সোনালী শিশির”

এই বিষন্ন পৃথিবীতে, মানুষকে হাসানো একইসাথে কল্পনার জগতে ভাসানো বড়ই দুঃসহ কাজ। আর সেই কাজটি যখন কেউ লেখনীর মাধ্যমে সম্পাদন করতে চায়, চরিত্র চিত্রন এবং ঘটনাপ্রবাহে সামান্য বিচ্যুতিই হতে পারে সেই মহৎ উদ্দেশ্য সাধনের পথে সবচেয়ে বড় বাধা। কিন্তু সাহিত্যিকের কলমের ফোয়ারা তো অবাধ্য ঝর্ণার মত। শত বাধা সত্ত্বেও পাঠক হৃদয়ে আছড়ে পরার লোভ তারা সামলে উঠতে পারে না। ঠিক যেমনটি পারেননি কথাসাহিত্যিক অরুণ কুমার বিশ্বাসও। রচনা করেছেন কৌতুকাবহ, রহস্যাবৃত এক অনন্য উপন্যাস “স্পাই”। আজ এই উপন্যাস ব্যবচ্ছেদের প্র‍য়াসে অবতীর্ণ আমি।

কোন এক ব্যস্ত শহরে অসম-দ্বন্দ্বে ক্লান্ত পরাজিত, দুই কিশোরের ঘুরে দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতার আলোকে নির্মিত হয়েছে উপন্যাসটি। এই বিষাদনগরে নির্ঘুম রাতে সহসাই যদি বাসনা জাগে, এমন এক পৃথিবী ভ্রমণের যেখানে আপনি এডভেঞ্চারাস হওয়ার স্বাদ নিতে চান, কিছুটা শিহরিত এবং প্রেমাকুল আর রসিকতায় বুঁদ হয়ে সবশেষে যদি আত্মপ্রত্যয়ী হতে চান, তাহলে স্পাই-ই হবে আপনার সর্বোত্তম সঙ্গী।

“Final Destination” চলচিত্রের শুরুর দৃশ্যপট মনে আছে? বিমান দুর্ঘটনার কবলে পরা যাত্রীদের আহাজারি দর্শক হৃদয়ে যে ধরনের ভয়ানুভূতি সৃষ্টি করেছিল ঠিক তেমনি গল্পের শুরুতেই বোয়িং ৭৮৭-এর ইমার্জেন্সি ল্যান্ডিং এর ঘটনায় শিউরে উঠতে বাধ্য হবেন। রনি এবং তার বন্ধু সজীব এ-যাত্রায় বেঁচে গিয়ে মঙ্গোলিয়ার পরিবর্তে অবতরণ করে জাপানে। সেখানেই শুরু দুই বন্ধুর ভাগ্য বিড়ম্বনার।

উপন্যাসের প্রোটাগনিস্ট মিষ্টিমাখা ছোট্ট রনি একটু চঞ্চল এবং সরসতাপূর্ণ হলেও সময়ের প্রয়োজনে খানিকটা বুদ্ধিমানও বটে। এদিকে, বোকাকান্ত সজীব সহজ-সরল, পেটুক এবং ব্যর্থপ্রেমিক। জাপানের জনবহুল নগরী হোনশুতে এসে এই দু-চরিত্রের মানুষের মিলনে তালগোল পাকিয়ে নিমকুর হাতে কিডন্যাপ হওয়াটা খুব স্বাভাবিক।

উপন্যাসের এন্টাগনিস্ট নিমকু এক দুর্ধর্ষ স্মাগলার। শহরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে তার নেটওয়ার্ক। বিভিন্ন দুর্লভ-অমূল্য জিনিসের পাচারে হাতপাকা নিমকুর বিরুদ্ধে জাপানি পুলিশের রেড এলার্ট জারি করা। এই লোকের খপ্পরে পরে পাসপোর্ট খুইয়ে সর্বস্বান্ত রনি আর সজীব বাধ্য হয়ে নাম লিখিয়েছে স্মাগলারদের তালিকায়।
পরেছে নিমকুর হাত, এবার বুঝি খেতে হবে জেলের ভাত!

গল্পের নায়িকা তুসকানা রুশি বারজিয়া উর্ফে তুবা (তুসকানার তু এবং বারজিয়া’র বা)। সজীবের কাছে মিষ্টি হাসির, সুরেলা তুবার মুখখানা বড্ড মায়াবী ঠেকলেও রনির কাছে তুবা এক রহস্যের আধার। কে জানে এ-মেয়েও হয়ত নিমকুরই স্পাই! তবে তুবা আপাতত বেশ উপকারী। তুবার কল্যাণেই জাপানের ঐতিহ্যবাহী সুমো কম্পিটিশন, নিহোন ইচিবান (স্পেশাল চা), তেন্নোজি টেম্পলসহ বিভিন্ন জায়গার সাথে পরিচিত হওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল দুই বন্ধুর।

একবার প্লাটিনামের বার পাচারকালে রনি ও সজীবের ঘটনাক্রমে পরিচয় হয় আকাশের সাথে। কোলকাতার ছেলে আকাশ বেশ বাঙালি-প্রেমিক। স্ব-ভাষাভাষী মানুষের বিপদের কথা জানতে পেরে নিমকুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এবার আকাশও সামিল হয়।

এছাড়াও গল্পের ধারাবাহিকতায় আরও কিছু চরিত্র এসেছে। কামির উপাসক এসেছেন দৈব শক্তির আধার হিসেবে। তিনি ভবিষৎবাণী করেছিলেন রনি আর সজীবের অ্যারেস্ট হওয়ার ব্যাপারে। টাক মাথার কমান্ডার হরিকিতা স্থান পেয়েছে হাস্যকর পুলিশ চরিত্র হিসেবে। পুলিশের বড়কর্তা গোহারা মুচু নিমকুকে অ্যারেস্ট করার গুরুদায়িত্বে নিয়োজিত ছিল। দায়িত্ব পালনে গোহারা মুচু গু-হারা হেরেছিল কিনা তা জানতে হলে পড়তে হবে উপন্যাসটি।

ঘটনাপ্রবাহের সাথে তাল মিলিয়ে চরিত্র চিত্রনে আত্মদ্বন্দের বিড়ম্বনায় ভোগেন লেখকেরা। কিন্তু লেখক অরুণ কুমার বিশ্বাসের হাতে চিত্রার্পিত উচ্ছ্বল প্রাণের স্পন্দনগুলো দীপ্তি হয়ে মুক্তো ছড়িয়েছে সম্পূর্ণ উপন্যাসজুড়ে। লেখকের সাপ হয়ে দংশন করে, ওঝা হয়ে ঝারার পান্ডিত্যে আমি মুগ্ধ।

আমার বিচারে উপন্যাসের স্বার্থকতা অধিকাংশে নির্ভর করে গল্পের তিনটি উপাদানের যথাযথ সমন্বয়ের উপর- ১) বিনোদনমূলক উপাদান, ২) উপলব্ধিমূলক উপাদান এবং ৩) তথ্যসূচক উপাদান। এই তিন উপাদানের সমন্বয় স্পাই উপন্যাসে স্পষ্টতই ফুটে উঠেছে। রহস্যের বাতাবরণ, ভয়ানুভূতি, রোমাঞ্চ কিংবা মজার মজার ছড়া জুড়ে দিয়ে লেখক আমাদের যেমন বিনোদিত করেছেন একইসাথে গল্পের এক পর্যায়ে স্মৃতিকাতর হয়ে স্বদেশের প্রতি মমত্ববোধও জাগ্রত করেছেন। জাপানের পরিচ্ছন্নতার সাথে বাংলাদেশের তুলনা করে কিংবা বুড়িগঙ্গার নাজেহাল অবস্থার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে পরিবেশের প্রতি সচেতন হওয়ার দিক নির্দেশ করেছেন। সবশেষে বাঙালি দামাল ছেলেদের সাহসিকতার প্রশংসায় মুখর হয়ে জাতীয়তাবোধের উন্মেষ ঘটিয়েছেন লেখক। তাছাড়া রসিকতার ছলে জাপানের জীবনযাত্রা, ভাষা, খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে তথ্য দেওয়ার চেষ্টায়ও সফল হয়েছেন তিনি।

প্রমথ চৌধুরীর দুর্বোধ্য শব্দ প্রয়োগের বিরুদ্ধে শুরু করা আন্দোলনের স্বার্থকতা পেয়েছে অরুণ কুমার বিশ্বাসের “স্পাই” উপন্যাসে। সম্পূর্ণ গল্পের শব্দচয়ন ছিল অত্যন্ত প্রাঞ্জল এবং সহজবোধ্য। বেশ কিছু জায়গায় আঞ্চলিক শব্দের (লবডঙ্কা) প্র‍য়োগ মোহিত করেছে। উপন্যাসে জাপানি শব্দের ব্যবহারের কারণেই আপনার “একমাসে জাপানি শিক্ষা” বই আর পকেটে নিয়ে ঘুরতে হবে না। ইংরেজি শব্দের বহুল ব্যবহার অনেকের কাছে বিরক্তিকর ঠেকলেও আমার মনে হয়, ইংরেজিয়ানের যুগে পাঠক হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়ার এ-এক অভিনব কৌশল।

আমাদের সমাজে সহজ-সরল কিশোরেরা স্বভাবতই ভাল ছাত্র এবং চঞ্চলেরা অমনোযোগী হয়ে থাকে। কিন্তু লেখক উপস্থাপন করেছেন ঠিক তার উল্টো চিত্র। জালাইলোফোবিয়া সম্পর্কে না জানায় লেখক রনিকে সজীবের উপর একহাত নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়ায় হয়তো অনেক সহজ-সরল মেধাবীরা কষ্ট পেয়ে থাকবেন। যেমনটা আমিও পেয়েছি।

এতক্ষণে আপনি হয়তো ভাবছেন উপন্যাসের নামকরণ যথার্থ হয়েছে কিনা! নামকরণের রহস্যটাও লেখক উন্মোচন করেছেন গল্পের একেবারে ক্লাইম্যাক্সে। জাপানি পুলিশের হয়ে, গল্পের প্রধান চরিত্র রনির গুপ্তচারিতার ইতিবাচকতা বিবেচনায় উপন্যাসের নামকরণ স্বার্থক হয়েছে বলে মনে করি।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ডাবল এজেন্ট হিসেবে কাজ করা মাতাহারির সত্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে পাওলো কোয়েলহোর “দ্য স্পাই” উপন্যাস নির্মিত হয়েছে। অনেক ঔপন্যাসিক ফিকশনাল উপন্যাস তৈরির জন্য আশ্রয় নিয়ে থাকেন টাইম-ট্রাভল, ম্যাটেরিয়ালকে ডিম্যাটেরিয়াল করার মত অবাস্তব সব কল্পকথার। কিন্তু লেখক অরুণ কুমার বিশ্বাস সত্যঘটনা নির্ভর গতানুগতিক গুপ্তচারিতামূলক কিংবা ফিকশনাল গল্পগুলোর বাইরে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন বাস্তবসম্মত কল্পকাহিনীর। এই রসিকতাপূর্ণ, গুপ্তচারিতা মিশ্রিত সাহিত্য সাগরে অবগাহনের জন্য আপনার বাংলা সাহিত্যে পি.এইচ.ডি ডিগ্রি অর্জনের প্রয়োজন নেই। জীবনের এ-পর্যায়ে, সাহিত্য অঙ্গনের এক অভিনব রস আস্বাদনের অভিপ্রায় থেকে থাকলে উপন্যাসটি একবার হলেও পড়ে দেখবেন। কথা দিচ্ছি, আশাহত হবেন না।

ঔপন্যাসিক সম্পর্কে কিছু কথা বলি। ঔপন্যাসিকের “স্পাই” উপন্যাসটি ইতিমধ্যেই বেশ সাড়া জাগিয়েছে। “স্পাই” উপন্যাসের জন্য ইতিমধ্যেই লেখক এসিআই-আনন্দ আলো সাহিত্য পুরষ্কার-২০১৮ তে ভূষিত হয়েছেন। জাপানি ভাষার উপর লেখকের দখল দেখে আমি মুগ্ধ। শুনেছি লেখক বড্ড ভ্রমণপিপাসু মানুষ, হয়তো জাপান ভ্রমণের সুযোগও হয়েছিল উনার। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের দায়িত্বশীল পদে থেকেও নিয়মিত পত্রিকায় লেখালিখি করা একই সাথে বই লেখা সহজ কাজ নয়। কিন্তু তিনি অত্যন্ত সুচারুভাবে সকল দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। লেখকের সবচেয়ে বেশি আগ্রহের জায়গা গোয়ান্দা এবং এডভেঞ্চারধর্মী গল্প। এপার বাংলায় এধরনের বইয়ের সংখ্যা অতি নগন্য। আশাকরি লেখক অরুণ কুমার বিশ্বাসের “জলপিপি”, “কফিমেকার”, “আলিম বেগের খুলি”, “অথই আঁধার”, “স্পাই” এবং নতুন তৈরি করা প্লাটফর্ম “দ্য ডিটেকটিভস” সেই অপূর্ণতা ঘোচাবে।

শেষ করার আগে বইয়ের প্রচ্ছদ নিয়ে দু-একটি কথা না বললেই নয়। প্রাতরাশের পূর্বে প্রতিটি মানুষের তৈরি করা ১৮ ক্যারেটের স্বর্ণদলার রঙের সাথে বইয়ের প্রচ্ছদের রঙ গুলিয়ে ফেলে অনেকেই হয়তো ব্যঙ্গ করবেন। তবে মনে রাখবেন, প্রতিটি সোনালী পৃষ্ঠায় লুকিয়ে আছে কারি-কারি রহস্য আর অক্ষরগুলো সেই স্বর্ণদলার সুগন্ধি বৃদ্ধিতে নিবিষ্ট।

বিঃদ্রঃ রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ হুইস্কির বাংলাকরণ করেছিলেন “সোনালী শিশির”।

ধন্যবাদ।

★বই সংক্রান্ত তথ্য :

বইয়ের নামঃ স্পাই
ধরনঃ অ্যাডভেঞ্চারধর্মী উপন্যাস
ক্যাটাগরিঃ মূল বই
লেখকঃ অরুণ কুমার বিশ্বাস
প্রচ্ছদঃ নিয়াজ চৌধুরী তুলি
প্রকাশনাঃ পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.
প্রথম প্রকাশঃ ফেব্রুয়ারি ২০১৮
মুদ্রিত মূল্যঃ ২৩০
পৃষ্ঠাঃ ১২৮
ISBN : 978-984-92955-7-0
প্রাপ্তিস্থানঃ পাঠক সমাবেশ কেন্দ্র

★ব্যাক্তিগত রেটিংঃ ৮/১০

★রিভিউদাতার তথ্যঃ

নামঃ প্রান্ত বনিক
পেশাঃ শিক্ষার্থী
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানঃ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
বিভাগঃ মার্কেটিং (৪র্থ বর্ষ)
ঠিকানাঃ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, সাভার, ঢাকা।

নিউজ গার্ডিয়ান/ ০৯:৪৫/ এমএ/