চারদিকে শুধু সায়মা, নুসরাত, তনুদের আর্তনাদ

জাহিদুল হক

অস্থির সময় যাচ্ছে। বাতাসে শুধু দুঃসংবাদের ছড়াছড়ি। সকাল হলেই ভাবি কোন দুঃসংবাদ অপেক্ষা করছে। বিশ্বায়নের এই যুগে সমাজের কাঠামো প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হচ্ছে। ধর্ষন, হত্যা, নির্যাতনের সংবাদ এখন নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা। দিন দুপুরে সংঘবদ্ধ ভাবে কুপিয়ে হত্যা করছে। বরগুনার রিফাত হত্যাকান্ড এর জলন্ত প্রমাণ।

আশঙ্কাজনক হারে এর সংখ্যা বেড়েই চলছে। কোথায় নিরাপদ নয়- বাসে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, মাদ্রাসায়, বিশ্ববিদ্যালয় গুলোও বাদ যাচ্ছে না এর ভয়াল থাবা থেকে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে এর বিরুদ্ধে এখনও কোন শক্তিশালী প্রতিবাদ হচ্ছে না। যা হয় শুধু ফেইসবুকে।

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন এর তথ্য অনুযায়ী গত ছয় মাসে ধর্ষণের পরিমাণ ভয়াবহ। সারাদেশে ৩৯৯ জন শিশু ধর্ষণ ও ধর্ষণ চেষ্টার শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ৮ জন ছেলে শিশু। ধর্ষণের পরে একজন ছেলে শিশুসহ মারা গেছে ১৬ শিশু। এদের মধ্যে ধর্ষণের চেষ্টা চালানো হয়েছিল ৪৪ জনের উপর।

ছয়টি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত ৪০৮টি সংবাদ বিশ্লেষণ করে এই পরিসংখ্যান তুলে ধরে সংগঠনটি।

এসব ধর্ষণের ঘটনার মধ্যে অতি সম্প্রতি বেশকিছু ঘটনা আলোচিত হয়েছে। যেমন- সর্বশেষ শিশু সায়মা হত্যা, তার আগে নুসরাত,তনু হত্যাকান্ড ছিল সবচেয়ে আলোচিত।

৭ বছরের শিশু সায়মা মাকে বলেছিল ‘১০ মিনিট পরে আসতেছি।’ কিন্তু সাময়া আর ফিরল না। কি ভয়ংকর ভাবে সায়মাকে হত্যা করা হয়। সায়মার ঘটনায় শুধু তাঁর পিতামাতাকে নয়, গোটা দেশের মানুষকে আহত করেছে।

কেন এই ভয়ানক চিত্র আজ আমাদের সামনে। অনেক গুলো কারণ হয়তো খুঁজলে পাওয়া যাবে। এর জন্য প্রয়োজন বড় ধরনের সামাজিক গবেষণা ও সচেতনতা। অনেকেই সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন বিচারহীনতাকে। ধর্ষনের ঘটনার সুষ্ঠু বিচার হয় না। আদালতের দীর্ঘসূত্রিতা আর প্রভাবশালী মহলের চাপে আসামিদের বিচার হয় না। একটি অপরাধের বিচার না হলে আরো অপরাধের বিস্তার লাভ করে।

বেসরকারি সংস্থা নারীপক্ষ বলছে, তারা এক গবেষণার অংশ হিসাবে ২০১১ সাল থেকে ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত ছয়টি জেলায় ধর্ষণের মামলা পর্যবেক্ষণ করেছে। এ গবেষণাটির পরিচালক এবং নারীপক্ষের প্রকল্প পরিচালক রওশন আরা বলেন, ‘এ সময়ে ৪৩৭২টি ধর্ষণের মামলা হয়েছে, কিন্তু সাজা হয়েছে মাত্র পাঁচ জনের। আলোচিত তনু হত্যা মামলার কোন অগ্রগতি নেই। ২০১৬ সালের ২০ মার্চ রাতে ক্যান্টনমেন্ট এলাকা থেকে তনুর মৃত্য দেহ উদ্বার করা হয়। সিআইডি তদন্তে তনুর পরিহিত পোশাকে তিনজনের বীর্য পাওয়া যায়। সেগুলোর নমুনা সংগ্রহ রাখা হয়েছে। তারপর মামলার তদন্তের আর কোন অগ্রগতি হয় নাই। ‘

‘নোয়াখালীর সুবর্নচরে চার সন্তানের জননীকে ধর্ষনের ঘটনায় ভাবিয়েছে সবাইকে৷ আসামী গ্রেফতার করা হয়েছে। বিচার পাবে কি না সন্দেহ রয়ে গেছে। কারন আসামীরা প্রভাবশালী।

সাম্প্রতিক সময়ে আরে একটি আলোচিত ঘটনা নুসরাত হত্যা। চিন্তা করা যায় মাদ্রাসার শিক্ষকের কথা অনুযায়ী কাজ না করার জন্য তাঁকে পুড়িয়ে হত্যার শিকার হতে হয় । কোথায়ও আজ নিরাপদ না, যে মাদ্রাসাকে মানুষ ভাবত ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অথচ সেখানে উদ্বেগজনক ভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। কয়েকদিন আগে নেত্রকোনার এক মাদ্রাসা শিক্ষককে গ্রেফতার করা হয়। সে ১০ জনকে ধর্ষণের কথা স্বীকার করেছে।

এর আগে নারায়নগঞ্জে এক শিক্ষক কে গ্রেফতার করা হয়েছে। ছাত্রীদের ব্ল্যাকমেইল করে ধর্ষণ করত। কি হচ্ছে দেশে চারদিকে শুধু ধর্ষণের ঘটনা।

আমরা যে উন্নয়নের কথা বলি সে উন্নয়ন সাময়া, তনু,নুসরাতদের আর্তনাতে অন্তঃসারশূন্য। উন্নয়ন শুধু অবকাঠামোগত হলে হয় না তার সাথে মানব সম্পদের উন্নয়ন না ঘটলে এই উন্নয়নের সুফল কেউ পায় না। সকল অর্জনই হয়ে যাবে মলিন। বাংলাদেশে ধর্ষনের শাস্তির আইন রয়েছে প্রয়োগ হয় না।

ধর্ষনের শাস্তি: নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯ ধারায় ধর্ষণের শাস্তি সম্পর্কে বলা হয়েছে—

ধারা ৯(১): কোন পুরুষ কোন নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করলে তিনি যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করবেন। এবং এর অতিরিক্ত অর্থদণ্ডও তাকে দেয়া যেতে পারে।

ধারা ৯(২): ধর্ষণের ফলে বা ধর্ষণের পড়ে অন্য কোন কাজের ফলে ধর্ষিত নারী বা শিশুর মৃত্যু ঘটলে ধর্ষণকারী মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করবেন। এছাড়াও তাকে এক লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করা হবে।

ধারা ৯(৩): একাধিক ব্যক্তি দলবদ্ধভাবে কোন নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করলে এবং ধর্ষণের কারণে উক্ত নারী বা শিশুর মৃত্যু ঘটলে তাহলে ধর্ষকরা প্রত্যেকেই মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। এছাড়াও তাদেরকে অন্যূন এক লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করা হবে।

ধারা ৯(৪): যদি কোন ব্যক্তি কোন নারী বা শিশুকে

(ক) ধর্ষণ করে মৃত্যু ঘটানোর বা আহত করার চেষ্টা করেন তাহলে উক্ত ব্যক্তি যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড এবং এর অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হবেন।

(খ) যদি ধর্ষণের চেষ্টা করেন তাহলে উক্ত ব্যক্তি অনধিক দশ বছর কিন্তু অন্যূন পাঁচ বছর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং এর অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হবেন।

ধারা ৯(৫): পুলিশ হেফাজতে থাকাকালীন কোন নারী ধর্ষিত হলে, যাদের হেফাজতে থাকাকালীন উক্ত ধর্ষণ সংঘটিত হয়েছে, সে ব্যক্তি বা ব্যক্তিগণ উক্ত নারীর হেফাজতের জন্য সরাসরি দায়ী হবেন। এবং তাদের প্রত্যেকে অনধিক দশ বছর কিন্তু অন্যূন পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। এবং এর অতিরিক্ত অন্যূন দশ হাজার টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল: নারী ও শিশু নির্যাতন-সংক্রান্ত সব অপরাধের বিচারকাজ পরিচালনার জন্য সরকার প্রত্যেক জেলা সদরে একটি করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল নামক বিশেষ আদালত গঠন করেছে। ধর্ষণের বিচারও এই ট্রাইব্যুনালে হবে।

আমরা সবসময় যা দেখি, মামলা শেষ হতে অনেক দিন সময় নেয়। কিন্তু এই আইনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, ‘মামলা প্রাপ্তির তারিখ হতে ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার প্রক্রিয়া শেষ করতে হবে।’ [নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ধারা ২০(৩)

অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে যে ধর্ষনের ঘটনা সালিশের মাধ্যমে সমাধান করে দেয়া হয়। যেখানে প্রভাবশালী ধর্ষকদের বিচার হয় না। নামমাত্র শাস্তি দিয়েই সমাধান করে দেয়া হয়।

এর সমাধান কোথায় অনেকই সমাধানে নানা রকম মতামত প্রদান করেছেন। তা হচ্ছে- বিচার হীনতার সংস্কৃতি দূর করতে হবে প্রতিটা ধর্ষকের বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

অভিভাবক, শিক্ষক,তরুন, যুব সমাজ সবাই মিলে সামাজিক সচেতনতা তৈরি করতে হবে।

সামাজিক মূল্যবোধ অবক্ষয় রোধ করতে হবে।

ধর্ষকদের প্রকাশ্য ফাঁসি দিতে হবে। যেন আর কেউ ধর্ষন করার সাহস না করতে পারে।

সরকার আইন প্রয়োগে কঠোর হতে হবে।

সাংস্কৃতিক আগ্রাসন প্রতিরোধ করতে হবে।নীল ছবির অবাধ বিচরন বন্ধ করতে হবে।

ধর্মীয় মূল্যবোধ জাগ্রত করতে হবে।

দলমত নির্বিশেষে ধর্ষকদের বিরুদ্ধে সবাইকে শক্তিশালী ভূমিকা নিতে হবে।

এভাবে যদি প্রতিদিন এমন ঘটতে থাকে তাহলে রাষ্ট্রের সকল উন্নয়ন হয়ে যাবে অন্তঃসারশূন্য। সায়মাদের চিৎকারের বাতাস হবে ভারী। উন্নয়নের উপরে থাকবে স্বজন হারানোর হাহাকার। তাই শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন না করে মানবসম্পদের উন্নয়নের দিকে জোর দেয়া উচিত। মানবিক, মূল্যবোধের উন্নয়ন ঘটাতে হবে। সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় রোধ করতে হবে। ধর্ষক যেই হোক তার চূড়ান্ত শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একটি অপরাধের বিচার না হলে অপরাধী উৎসাহ পায় অপরাধ সংগঠিত করতে তাই বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করতে হবে। সবশেষে এইসব অমানবিক, পৈশাচিক অপরাধকে রোধ করার জন্য সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। হত্যা, ধর্ষন এর মতো অপরাধের বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।মনুষ্যত্ব ও বিবেককে জাগ্রত করে এই সমস্যা মোকাবেলা করতে হবে।

লেখক: সাবেক শিক্ষার্থী, সরকার ও রাজনীতি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

নিউজ গার্ডিয়ান/ এমএ/