ডোনাল্ড ট্রাম্প বনাম মার্কিন কংগ্রেসের চার নারী

জুবায়দা আফরোজ বাবলী

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫ তম প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড জন ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিভিন্ন কর্মকান্ডের জন্য আন্তজার্তিক পরিমন্ডলে নানাভাবে আলোচিত ও সমালোচিত হয়েছেন। ডোনাল্ট ট্রাম্প কখনো প্রতিপক্ষদের সাথে বাকযুদ্ধ, টুইট যুদ্ধে জড়িয়ে কখনো বা তীব্র অভিবাসী বিরোধী মনোভাব দেখিয়ে কখনো বা বর্ণবাদী আচারণ করে, কিংবা অবৈধ সম্পর্কের জের ধর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছেন।তবে সম্প্রতি টুইটারে মার্কিন কংগ্রেসের চার নারী সদস্যদের প্রতি বর্ণবাদী মন্তব্যের ফলস্বরূপ মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে তার বিরুদ্ধে নিন্দা প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার ঘটনা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে নজীর সৃষ্টি করেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের চার নারী সদস্য ইলহান ওমর.রাশিদা তালিব,আলেকজান্দ্রিয়া ওকিসাও কর্টেজ ও আয়ান্না প্রেসলিকে উদ্দেশ্য করে টুইটারে বর্ণবাদী মন্তব্যে বলেন- “তারা এমন সব দেশে থেকে এসেছে যেখানে চলে নানা অনিয়মও দুর্নীতি। এখন তারা আবার যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করছে। তাহলে তারা নিজ দেশে ফিরে যেতে পারে”। আত্মপক্ষকে সমর্থন করে ট্রাম্প এটিও উল্লেখ করনে যে,“তিনি বর্ণবাদী নন,তার শরীরের হাড়ে কোন বর্ণবাদের বিন্দুমাত্র ছোঁয়া নেই”

এই বর্ণবাদী মন্তব্যের প্রতিক্রিয়া স্বরূপ মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ্ হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভে ২৪০/১৮৭ ভোটের সমর্থনে নিন্দা প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। এমনকি কংগ্রেস সদস্য আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও কর্টেজ ট্রাম্পের আত্মপক্ষ সমর্থনের স্পষ্ট জবাব দিয়ে বলেন-“তাঁর হাড়ে বর্ণবাদ নেই, বর্ণবাদ আছ তার হৃদয়ে এবং মগজে। এই নিন্দা প্রস্তাবে চারজন রিপাবলিকান সদস্য ও একজন স্বতন্ত্র সদস্য সমর্থন দেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সর্বপ্রথম কোন প্রেসিডেন্টের বিপক্ষে গৃহীত নিন্দা প্রস্তাব নিয়ে যখন আলোচনা তুঙ্গে তখন যে প্রশ্ন দুটি সামনে আসছে তা হল কারা এই চার নারী যাদের বিরুদ্ধে বর্ণবাদী মন্তব্য করায় ট্রাম্পের বিরুদ্ধে নিন্দা প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে? আর আইনগত ভিত্তি না থাকা এই প্রস্তাবের প্রভাবই বা কতটুকু? সোমালী বংশোদ্ভুদ প্রথম নারী মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য হিসেবে নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচনে মিনিসোটা অঙ্গরাজ্য থেকে নির্বাচিত হন ইলাহান ওমর। ১৯৯৭ সালে সোমলিয়ার গৃহযুদ্ধে সময় অভিবাসী হয়ে সপরিবারে যুক্তরাষ্ট্রে আসেন এবং ২০০০ সালে মার্কিন নাগরিকত্ব পান। ব্যক্তিগত জীবনে তিন সন্তানের জননী ৩৭ বছর বয়সী ইলহান ওমর মার্কিন কংগ্রেসের দুইজন মুসলিম সদস্যের মধ্যে একজন। কংগ্রেসে নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি মার্কিন কংগ্রেসের ১৮৫ বছরের হিজাব পরিধান নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে লড়াই করেন ও হিজাবী নারী হিসেবে কংগ্রেসে প্রবেশ করেন। ২৯ বছর বয়সী আলকজান্দ্রিয়া ওকাসিও কার্তেজ মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থীকে পরাজিত করে সর্বকনিষ্ঠ কংগ্রেস প্রতিনিধি হন। পুয়োর্তোরিকান বংশোদ্ভুত নিউইয়র্কে জন্মগ্রনকারী আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও কার্তেজ বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে পড়শোনা করেন। স্পষ্টভাষী এই নারী অভিবাসীদের পক্ষে কথা বলা,দারিদ্র্য নিরোসন নিয়ে কাজ করা এবং রিপাবলিকানদের সরাসরি সমালোচনার জন্য মার্কিন রাজনীতির পাদপ্রদীপের আলোয় চলে আসেন। ফিলিস্তিন বংশোদ্ভুদ মুসলিম মার্কিন নাগরিক হিসেবে প্রথম কংগ্রেস সদস্য হয়ে রাশিদা তালিব ইতিহাস সৃষ্টি করেন মার্কিন মধ্যবর্তী নিবাচনে। মার্কিন কংগ্রেস সদস্য হলেও তার দাদী বর্তমান ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরে বসবাস করেন। ১৪ ভাইবোনের মধ্যে একমাত্র স্নাতক পাশ রশিদা তালিব প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অভিসংশন নিয়ে কথা বলা স্ষ্টভাষী একজন নারী। ক্ষমতাকে ভয় না পেয়ে সত্য কথা বলার কারণে তার রাজনৈতিক দৃঢ়তা ফুটে ওঠে। ৪৫ বছর বয়স্ক আফ্রো-আমেরিকান বংশোদ্ভূত আয়ান্না প্রেসলি ম্যাসাচুয়েস্টস অঙ্গরাজ্য থেকে কংগ্রেসে সদস্য হন। সিঙ্গেল মায়ের একমাত্র মেয়ে আয়ান্ন প্রেসলি নারীর গর্ভপাত অধিকার ও যৌন সহিংসতা নিয়ে কথা বলে থাকেন।২০০৯ সাল থেকে রাজনৈতিক জীবন শুরু করা আয়ান্না প্রেসলি ডোনাল্ট ট্রাম্পকে প্রেসিডেন্ট নয় বরং হোয়াইট হাউজ দখলকারী হিসেবে সম্মোধন করেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষায় কথা বলা এবং রিপাবলিকান সরকারের কট্টর সমালোচক এই চার নারীকে মার্কিন গণমাধ্যমগুলো “দ্যা স্কোয়াড” বলে আখ্যায়িক করছে। মার্কিন কংগ্রেসে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রবল প্রতিপক্ষ বিবেচনায় তাদের বিরুদ্ধে বর্ণবাদী টুইট করে যার প্রেক্ষিতে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে বহুল আলোচিত এই নিন্দা প্রস্তাব গৃহীত হল। এই নিন্দা প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার ফলাফল বিবেচনায় করেত গেলে বলা বাস্তবক্ষেত্রে এই নিন্দাপ্রস্তাবের আইনগত ভিত্তি না থাকলেও ট্রাম্পের চরিত্রের মূল্যায়নে ও পরবর্তী ২০২০ সালের নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে। নিন্দা প্রস্তাবের পক্ষে চারজন রিপাবলিকান সদস্যও ভোট প্রদান করে সুতরাং আগামী প্রেসিডেন্টশিয়াল ইলেকশনে যে খোদ রিপাবলিকান দলের সকলের নিরুঙ্কুশ সমর্থন ট্রাম্প পবে না এটাও স্পষ্ট হয়ে উঠে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের আচরণে কেবল ডেমোক্রাটরাই না বরং রিপাবলিকানরাও বিব্রত ও বিরক্ত এটিও স্পষ্ট হয়ে উঠে এই নিন্দা প্রস্তাবে পক্ষে চার জন রিপালিকান প্রতিনিধি পরিষদের সদস্যদের ভোট প্রদানের বিষয়টি থেকে। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এটা স্পষ্ট যে, ট্রাম্পের পরবর্তী নির্বাচনী এজেন্ডার মূলকেন্দ্রীভূত বিষয় হবে অভিবাসী ও সাদা জাতীয়তাবাদ যা তার অনুগত সমর্থকদের মধ্যে ঐক্য সৃষ্টি করলেও মার্কিন রাজনীতিতে বিরোধী দলের ঐক্যজোট গঠনে ভূমিকা রাখবে। মার্কিন কংগ্রেসের রিপালিকানদের তুমুল সমালোচনা করা চার নারী আয়ান্না প্রসলি,ইলহান উমর,রাশিদা তালিব ও আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও কর্তেজকে উদ্দেশ্য করে বর্ণবাদী মন্তব্য এবং এর প্রেক্ষিতে গৃহীত ঐতিহাসিক নিন্দা প্রস্তাব পৃথিবীব্যাপী বৈষম্যহীন ও সার্বজনীন সমাজ প্রতিষ্ঠায় ট্রাম্পের বিশ্বনেতৃত্বের যোগ্যতার মুখে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে।

লেখক: স্নাতকোত্তর অধ্যয়নরত আন্তজার্তিক সম্পর্ক বিভাগ, জাহঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

নিউজ গার্ডিয়ান/ এমএ/