করোনা ভাইরাসে আতঙ্ক নয়

করোনা ভাইরাস নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। বাংলাদেশে এ পর্যন্ত আক্রান্ত পাওয়া যায়নি। তবে এ রোগ থেকে সাবধান থাকার কথা জানিয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) উপাচার্য অধ্যাপক ড. কনক কান্তি বড়ুয়া।

তিনি বলেন, এই ভাইরাস প্রতিরোধে নিয়মিত হাত পরিষ্কার রাখতে হবে। মুখ ঢেকে হাঁচি, কাশি দিতে হবে। দেশের বাইরে থেকে কেউ এলে প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে যাওয়া যাবে না। পোষ্য প্রাণীদের সঙ্গে থাকার ক্ষেত্রেও সাবধান থাকতে হবে। এ রোগ থেকে বাঁচতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের কুশল বিনিময়ের ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনতে হবে। আক্রান্ত রোগীদের মাস্ক ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা। তারা আরও বলেন আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে করমর্দন ও কোলাকুলি থেকে বিরত থাকতে হবে।

মঙ্গলবার (২৮ জানুয়ারি) দুপুরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) ইমার্জেন্সি অব এ নিউ করোনাভাইরাস শীর্ষক জরুরি সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বিএসএমএমইউর বিভিন্ন বিভাগের বিশেষজ্ঞ ও অধ্যাপকরা ভাইরাসটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।

সেমিনারে বিএসএমএমইউয়ের বক্ষব্যাধি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. শামীম আহমেদ বলেন, চীনের উহান শহরের সি-ফুড (সামুদ্রিক খাবার) মার্কেট থেকে পশু-পাখি থেকে এই ভাইরাসের উৎপত্তি বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ যারা এই রোগে প্রথম দিকে আক্রান্ত হন তারা সবাই চাইনিজ নিউইয়ারের প্রস্তুতির জন্য কেনাকাটা করতে ওই সি-ফুড মার্কেটে গিয়েছিলেন। এই ভাইরাসে নিহত প্রথম ব্যক্তি সেই সি-ফুড মার্কেটের একটি দোকানের কর্মচারি ছিলেন।

তিনি বলেন, কোবরা সাপ নাকি বাদুরের মাধ্যমে ভাইরাসটি ছড়িয়েছে-এ নিয়ে এখনও দুই রকম মত রয়েছে। তবে পশু-পাখি বা স্তন্যপায়ী প্রাণী থেকে ছড়িয়েছে-এটা মোটামুটি নিশ্চিত। তবে বর্তমানে মানুষ থেকে মানুষে হাঁচি-কাশি, শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে।

করোনা ভাইরাসের লক্ষণ প্রসঙ্গে বিএসএমএমইউয়ের এই চিকিৎসক বলেন, এই ভাইরাসে আক্রান্তদের লক্ষণ হচ্ছে জ্বর, সর্দি, শরীরে দুর্বলতা, ডায়রিয়া। এ ভাইরাসে নিউমোনিয়া হয়ে ফুঁসফুঁস অকেজো হয়ে যায়। পরবর্তীতে কিডনি লিভারে কার্যকারিতা হারায়। এতে রোগীর মৃত্যুও হতে পারে।

করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর নির্দিষ্ট চিকিৎসা না থাকলেও জ্বরের জন্য প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ সেবন করা যেতে পারে বলে পরামর্শ দিয়েছেন ডা. শামীম আহমেদ।

তিনি বলেন, তবে আক্রান্তদের অবশ্যই আইসোলেটেড (আবদ্ধ ঘরে, আলাদা) থাকতে হবে। পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে। সম্প্রতি চীনের থেকে যারা ফিরে এসেছেন তাদের কারও যদি এমন লক্ষণ থাকে, তাহলে তাদের কাছ থেকে অধিক সতর্ক থাকতে হবে। এ ভাইরাস প্রতিরোধে তিনি সবসময় হাত ধুয়ে পরিষ্কার রাখা ও নাকে মাস্ক পড়ার পরামর্শ দেন।

বিএসএমএমইউয়ের অভ্যন্তরীণ মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. নাজমুল হাসান বলেন, গতকাল পর্যন্ত আড়াই হাজার মানুষের তাপমাত্রা পরীক্ষায় এ ভাইরাস শনাক্ত হয়নি। জাতীয় বক্ষব্যাধি হাসপাতাল ও কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে আইসোলেশন দুইটি ওয়ার্ড খোলা হয়েছে। এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের বক্ষব্যধি, ভাইরোলজি বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগের চিকিৎসক ও নার্সরা সতর্ক রয়েছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় একাধিক সভা করেছে এবং বৈজ্ঞানিক সেমিনারের আয়োজন করেছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় জনসচেতনতা সৃষ্টিতে ব্যপক প্রচার-প্রচারণ শুরু করেছে।

বাংলাদেশে বসবাসরত উপজাতিরা সাপ খায়। তাদের এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা আছে কি না। উত্তরে ডা. শামীম আহমেদ বলেন, চীনের গবেষকরা বলছেন, একটি সাপের মাধ্যমে এ ভাইরাস ছড়িয়েছে। আবার অনেকে বলছেন, যে সাপের মাধ্যমে করোনা ভাইরাস ছড়িয়েছে, সেই সাপটি ভাইরাসে আক্রান্ত একটি বাদুর খেয়েছিল। তা যা-ই হোক, আমাদের দেশে এসব বিষয়ে সবাইকে সচেতন হতে হবে।

তিনি বলেন, করোনা ভাইরাস থেকে আরও বিপজ্জনক হচ্ছে নিপা ভাইরাস। এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে অনেকেই মারা যাচ্ছেন। এটি নিয়েও আমাদের সচেতন থাকতে হবে।

বিএসএমএমইউয়ের রেসপিরেটরি মেডিসিন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. এ কে এম মোশাররফ হোসেন বলেন, এই রোগের প্রতিরোধ হিসেবে চীন থেকে কেউ এলে তাকে ১৪ দিন আইসোলেটেডে রাখতে হবে। এছাড়া কারও সঙ্গে দেখা হলে করমর্দন, কোলাকুলির বদলে হাই-হ্যালো বলতে হবে। সবসময় হাত ধুতে হবে, এমনকি নাকে হাত দেয়ার সময়ও হাত ধুয়ে নিতে হবে।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. আহমেদ আবু সালেহ, ভাইরোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী, ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. আব্দুর রহিম ও শিশু বিভাগের অধ্যাপক ডা. সেলিনা খানমসহ অনেকে।